প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকের ওপর ১৫% মূলধনি কর আরোপকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল। এতে আবাসন খাত, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
দেশের আবাসন খাতে নতুন করে প্রস্তাবিত কর কাঠামোকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়ছে। জমি বা ফ্ল্যাট মালিকের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর আরোপের সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (REHAB)-এর সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে, যা সরকারের রাজস্ব আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আবাসন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। তার মতে, আবাসন খাতকে কর আদায়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন ব্যবসা সাধারণ পণ্যের মতো নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর খাত। এখানে একটি প্রকল্প সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চুক্তি ও ব্যয় নির্ধারিত থাকে। কিন্তু হঠাৎ কর বৃদ্ধি পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়ে গেছে, যার ফলে ফ্ল্যাটের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। একই সঙ্গে বাজারে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর আরোপ খাতটিকে আরও সংকটে ফেলবে।
রিহ্যাব সভাপতির মতে, নতুন করের কারণে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই পড়বে। কারণ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কখনোই লোকসান বহন করবে না। এতে আগের চুক্তিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নেও জটিলতা তৈরি হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি জমির মালিকদের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, অনেক জমির মালিক ডেভেলপারদের সঙ্গে যৌথ চুক্তির মাধ্যমে ফ্ল্যাট বা প্লট ভাগ করে নেন। কিন্তু নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে সেই মালিকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে, যা অনেকের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
ড. আলী আফজাল বলেন, দেশে আবাসন খাতের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীসহ একটি বড় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প জড়িত। এই পুরো সাপ্লাই চেইন ইতোমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, সঠিক নীতিমালার অভাবে দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন খরচ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বেশি। বাজারমূল্য ও সরকারি মৌজা মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকার কারণে লেনদেনে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, যা পুরো খাতকে জটিল করে তুলছে।
আবাসন খাতে সেকেন্ডারি বাজার না থাকাকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, গাড়ি বিক্রির মতো সহজ রিসেল ব্যবস্থা আবাসন খাতে থাকলে বাজার আরও গতিশীল হতো এবং অতিরিক্ত খরচ কমানো যেত।
ব্যাংকিং খাতের ঋণনীতিতেও বৈষম্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন রিহ্যাব সভাপতি। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা অন্যান্য খাতে থাকলেও আবাসন খাত সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। উপজেলা পর্যায়ে কম সুদে আবাসন ঋণ চালু করা গেলে নগরকেন্দ্রিক চাপ কমে যেত বলেও তিনি মত দেন।
ড্যাপ বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তার মতে, ভুল পরিকল্পনার কারণে কৃষিজমি রক্ষা ও নগরায়নের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর মতো পরিকল্পিতভাবে উচ্চ ভবন নির্মাণের সুযোগ দিলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও আধুনিক নগরায়ন সম্ভব।
তিনি আরও দাবি করেন, একই শহরের ভেতরে ভবনের উচ্চতা নিয়ে বৈষম্য রয়েছে, যা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই একটি সমন্বিত ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে শহরের উন্নয়ন ও বসবাসযোগ্যতা একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়।
সবশেষে তিনি বলেন, বর্তমান কর কাঠামো ও নীতিগত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করলে দেশের আবাসন খাত গভীর সংকটে পড়তে পারে, যার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়বে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!