ছবি: সংগৃহীত
দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বছরের শুরুতে লেনদেন বাড়লেও কয়েক মাসের ব্যবধানে তা অনেক কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণের হার কমেছে। পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহও কয়েক বছর ধরে ঋণাত্মক রয়েছে—অর্থাৎ নতুন অর্থ আসার তুলনায় বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ বেশি।
ডিএসইর পাক্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ৬৬৩ কোটি টাকায় উঠেছিল। মে মাসে তা নেমে আসে মাত্র ৭৪ কোটি টাকায়। জুন ও জুলাইয়ে লেনদেন আবার যথাক্রমে ৫৪০ কোটি ও ৫২৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আগস্টে কমে ৩১৯ কোটি টাকা হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৫৮১ কোটি টাকা হয়। তবে অক্টোবরের প্রথমার্ধে বিদেশিদের লেনদেন হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধের ৩৪৬ কোটি টাকার তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৬৬৩ কোটি হলেও মার্চে কমে ২৭২ কোটি এবং এপ্রিলে ১৭৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। মাসভিত্তিক এই পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তায় ধারাবাহিকতার অভাব তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে ডিএসইতে তাঁদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধেও বিদেশিদের লেনদেনে একই ধরনের ওঠানামা ছিল। ওই বছরের জুলাইয়ে লেনদেন হয় ৪৯১ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে ৩৭১ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৪৪০ কোটি টাকা হয়। অক্টোবরে আবার কমে দাঁড়ায় ৩৬৮ কোটি টাকায়। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে লেনদেন নেমে আসে যথাক্রমে ২৬৭ কোটি ও ১৪৬ কোটি টাকায়।
অর্থবছরের হিসাবেও লেনদেনের পরিমাণে পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ছিল ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের মোট অঙ্ক বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহের চিত্র আলাদা।
দেশীয় ঋণ সিকিউরিটিজে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহ ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ঋণাত্মক। ওই অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ ছিল ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ হাজার ৬০ কোটি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বহিঃপ্রবাহ সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে তা কমে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় নেমেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের হার কমার প্রবণতা রয়েছে। ২০১৬ সালে তাঁদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে লেনদেন বেড়ে ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা হলেও মোট লেনদেনে অংশগ্রহণের হার কমে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ হয়।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ছিল যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। ওই দুই বছরে মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২০ সালে লেনদেন বেড়ে ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা হয় এবং অংশগ্রহণের হার দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
তবে ২০২১ সাল থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকে। ওই বছর তাঁদের লেনদেন ছিল ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, কিন্তু ডিএসইর মোট লেনদেনে অংশগ্রহণ নেমে আসে ১ দশমিক ১০ শতাংশে। ২০২২ সালে লেনদেন হয় ৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা এবং অংশগ্রহণের হার ছিল শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা আরও কমে ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা ও শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা হলেও মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণ ছিল ১ দশমিক ২২ শতাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিবর্তনে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, শেয়ারদরের গতিপ্রকৃতি, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগসহ একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন বাড়ার কিছু নজির থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতিশীল প্রবাহ ফিরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
পুঁজিবাজার বিদেশি বিনিয়োগ
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!