যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনে জোর আইএমএফের

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ PM ৪৮
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনে জোর আইএমএফের

ছবি:সংগৃহীত

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে শুধু কর ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। এ জন্য টেকসই সরকারি অর্থব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ার পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনার কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।

আইএমএফের গবেষণা বিভাগের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এবং ২০২৬ সালের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ, বৈদেশিক সহায়তা হ্রাস এবং কঠিন অর্থায়ন পরিস্থিতির কারণে স্বল্প আয়ের দেশগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও অনেক দেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গতি দুর্বল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশে কর ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। তবে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল হলে এসব উদ্যোগের সুফল সীমিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।

সংস্থাটির ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের ইসাবেলা দুয়ার্তে বলেন, গবেষণায় আর্থিক শৃঙ্খলা, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে পারলে দেশগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

তাঁর মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

দুয়ার্তে বলেন, সব দেশের জন্য একই ধরনের সংস্কার কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে সংস্কারের পরিকল্পনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফের কারিগরি সহায়তা ও নীতিগত পরামর্শ ভূমিকা রাখতে পারে।তিনি আরও জানান, গবেষণাটি সরাসরি আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির প্রভাব মূল্যায়নের জন্য পরিচালিত হয়নি। তবে এর ফলাফল সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিনির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।ভঙ্গুর রাষ্ট্রে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ

আলোচনায় সোমালিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি কামাল গুতালি জানতে চান, সংঘাতপ্রবণ ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি গবেষণায় আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না।

তিনি বলেন, এসব দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতা ও সংঘাত বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জবাবে দুয়ার্তে জানান, গবেষণায় ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিনি আরও জানান, ঋণমুক্তির আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হাইলি ইনডেটেড পুওর কান্ট্রিজ (এইচআইপিসি) কর্মসূচির আওতায় থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী অবস্থার সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের তুলনামূলক জোরালো সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ফলাফল সব ভঙ্গুর ও সংঘাতপ্রবণ দেশের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।

আইএমএফের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় অর্থনীতিগুলোর নীতিগত পরিবর্তন স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। বাণিজ্যনীতি, অভিবাসন, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং বৈদেশিক সহায়তার পরিবর্তন এসব দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।

খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমে আসা এবং মার্কিন ডলারের দুর্বলতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক দেশ চাপে রয়েছে। অভিবাসননীতি কঠোর হলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকর অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে টেকসই মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে এ হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হয়েছিল।

একই সময়ে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৪ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ব্যাংককে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আলোচনায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়তা করছে।

আইএমএফের মতে, বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি অর্থব্যবস্থার সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে সংস্থাটির গবেষণার মূল বার্তা হলো, দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য নীতি, সুশাসন এবং কার্যকর সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!