ইউরোপে সংগঠিত অপরাধচক্রের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আলোচনায় নেদারল্যান্ডস। ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপে সংগঠিত অপরাধ ও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তুলনামূলক কম নজরদারি, শক্তিশালী বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বন্দরনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল–এর এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
লিভারপুলের গ্যাং সদস্যের মৃত্যুতে নতুন করে আলোচনায়
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের হিরহুগোয়ার্ড শহরের একটি শিল্পাঞ্চলে গুলিতে নিহত হন লিভারপুলের পরিচিত গ্যাং সদস্য পল পার্কার (৫২)। স্থানীয় তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে চলাচল করতেন। নেদারল্যান্ডসের অপরাধ জগতে তিনি ‘টমি’ নামে পরিচিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ ও ডাচ অপরাধচক্রের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে।
কেন নেদারল্যান্ডস?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের কস্তা দেল সোল অঞ্চলের মতো প্রকাশ্য সংঘর্ষের বদলে নেদারল্যান্ডসে অপরাধচক্রগুলো অপেক্ষাকৃত গোপনে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্যাফে, ব্যক্তিগত বৈঠক এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বড় মাপের মাদক লেনদেন সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সমুদ্রবন্দর রটারডাম দিয়ে বিপুল পরিমাণ কোকেন প্রবেশ করায় নেদারল্যান্ডস আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক পিটার ওয়ালশ বলেন, একসময় আমস্টারডাম কার্যত আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার ‘স্টক এক্সচেঞ্জে’ পরিণত হয়েছিল, যেখানে বড় বড় চুক্তি সম্পন্ন হতো।
ব্রিটিশ অপরাধচক্রের দীর্ঘ উপস্থিতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশক থেকেই ব্রিটিশ অপরাধচক্র নেদারল্যান্ডসে সক্রিয়। ১৯৯০-এর দশকে লিভারপুলের কুখ্যাত অপরাধী কার্টিস ওয়ারেন দেশটিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আমেরিকার মাদক কার্টেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি একসময় নেদারল্যান্ডসের একটি গ্রামীণ বাড়িতে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও এমডিএমএ মজুত করেছিলেন।
বর্তমানেও রটারডাম বন্দরের মাধ্যমে ইউরোপে বিপুল পরিমাণ মাদক প্রবেশ করে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত তল্লাশি ও দুর্নীতির সুযোগ এই পাচার কার্যক্রমকে সহজ করছে।
‘মোকারো মাফিয়া’র উত্থান
নেদারল্যান্ডসের অপরাধ জগতে বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেটওয়ার্কগুলোর একটি হলো ‘মোকারো মাফিয়া’। ডাচ-মরোক্কান অপরাধীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই চক্রের নেতা রিদুয়ান তাগি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সহিংস অপরাধের অভিযোগে আলোচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্ক ইউরোপজুড়ে কোকেন সরবরাহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের মধ্যে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সংগঠনটি অনেকটাই ব্যবসাকেন্দ্রিক কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে মুনাফাই প্রধান লক্ষ্য।
অপরাধ বিশ্লেষক ক্রিস ডালবি বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ ও ডাচ অপরাধচক্র যৌথভাবে কাজ করছে।
লাভই এখন প্রধান লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেদারল্যান্ডসে ব্রিটিশ অপরাধচক্রের মধ্যে প্রকাশ্য সংঘর্ষ তুলনামূলক কম দেখা যায়। কারণ, মাদক বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা ও সরবরাহ থাকায় প্রতিযোগিতা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে।
তবে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন, ঋণসংক্রান্ত বিরোধ বা বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাকে এখনো সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ইউরোপে মাদক ব্যবসার বিপুল আর্থিক লাভ আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীলতা তৈরি করলেও এর আড়ালে গড়ে উঠছে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক, যা আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি মেইল।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!