সংগৃহীত ছবি
ভারতে জাপানি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে। বড় করপোরেশনের পাশাপাশি জাপানের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানও ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে। ব্যাংকিং, গাড়ি, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, খুচরা ব্যবসা ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির মতো বিভিন্ন খাতে এই সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।
ভারতের বড় বাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা জাপানি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করছে। একই সময়ে জাপানের নিজস্ব বাজার সংকুচিত হওয়া এবং চীনে ব্যবসার ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিকল্প বাজার খোঁজার প্রবণতাও জোরালো হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জাপান সফর করে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বড় একটি ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও সফরে অংশ নেয়।
ভারতের বড় শহরগুলোতে জাপানি ব্র্যান্ডের উপস্থিতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ইউনিক্লো, মুজি ও ওনিতসুকা টাইগারের মতো প্রতিষ্ঠান সেখানে ব্যবসা করছে এবং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে।
জাপানের আসবাবপত্র নির্মাতা নিতোরিও ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। একইভাবে সুবিধাজনক পণ্যের দোকান চেইন লসনও ভারতে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। উৎসের তথ্য অনুযায়ী, লসন দীর্ঘমেয়াদে ভারতে ১০ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা করেছে।
আর্থিক খাতেও জাপানের বড় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বেড়েছে। জাপানের এমইউএফজি ব্যাংক ভারতের শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ শেয়ার কেনার জন্য ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। একই সময়ে সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ইয়েস ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী হয়েছে এবং ব্যাংকটির ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার তাদের হাতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতে জাপানি কোম্পানির উপস্থিতি শুধু পণ্য বিক্রি বা বিনিয়োগের মধ্যে সীমিত নেই। গবেষণা, প্রযুক্তি, কৌশলগত ব্যবসা পরিচালনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজও ভারত থেকে পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
ডেলয়েটের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারতে ১০০টির বেশি জাপানি কোম্পানি বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্র সাধারণত গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে কাজ করে।
এদিকে সুজুকি মোটর করপোরেশনের সহায়তায় পরিচালিত নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্স ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভারতের স্টার্টআপ ও ব্যবসায়িক খাতে নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
জাপানের জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে কমছে। এর ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা ও সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি সীমিত হচ্ছে। তাই জাপানি কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিদেশি বাজারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
চীন দীর্ঘদিন জাপানি কোম্পানিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীনে জাপানের বিনিয়োগ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও শুল্ক ও স্থানীয় প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসার চাপ রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোতে জাপানি কোম্পানির উপস্থিতি থাকলেও ভারতের বাজারের আকার তুলনামূলক বড়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে জাপানি কোম্পানিগুলো একযোগে চীন থেকে সরে ভারতে চলে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বরং ব্যবসার ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেও ভারতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন নয়। প্রায় দেড় দশক আগে দুই দেশ বাণিজ্য উদারীকরণসংক্রান্ত চুক্তিতে যায়। ২০১৪ সালে দুই দেশের সম্পর্ক ‘বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়।
এরপর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্প এগিয়েছে। মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প এর অন্যতম উদাহরণ, যেখানে জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা রয়েছে।
তবে বর্তমান পর্যায়ে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত ভারত-জাপান শীর্ষ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালও বলেছেন, জাপানের জন্য ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হতে পারে।
ভারতে ব্যবসার সুযোগ বাড়লেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু বাধা রয়েছে। করব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশগত অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো বিষয়গুলো বিনিয়োগের গতি কমাতে পারে।
বুলেট ট্রেন প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়েও জাপানের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে ভারতের সরকার সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফলে জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে ভারত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠলেও ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগ ধরে রাখতে ব্যবসার পরিবেশ আরও সহজ করা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে জাপানের সংকুচিত অভ্যন্তরীণ বাজার, চীনে বাড়তে থাকা ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং ভারতের বড় ও সম্ভাবনাময় বাজার—এই তিনটি বিষয় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দিচ্ছে। তবে এটিকে চীন থেকে জাপানের সম্পূর্ণ সরে আসা নয়, বরং ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও বাজারকে আরও বৈচিত্র্যময় করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!