রাজধানীর সার্ক কৃষি কেন্দ্রে আয়োজিত কর্মশালায় বক্তব্য দেন বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক খোরশেদ আলম; ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন বীজের প্রয়োজন হয়। তবে এই চাহিদার পুরোটা পরীক্ষিত বা ফরমাল উৎস থেকে আসে না। বীজের মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ ফরমাল, ৪০ শতাংশ সেমি-ফরমাল এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কৃষকের নিজেদের সংরক্ষণ করা বীজ। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পরীক্ষিত ও মানসম্মত বীজের ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক খোরশেদ আলম।
মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটের বিএআরসি ক্যাম্পাসে সার্ক কৃষি কেন্দ্রে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএআরএফ) সদস্যদের নিয়ে কর্মশালাটির আয়োজন করা হয়।
খোরশেদ আলম বলেন, কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জনের জন্য দেশের বীজ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ফরমাল সিড ব্যবস্থার দিকে নিতে হবে। পরীক্ষাগারে যাচাই ও মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আসা বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করা গেলে ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদনঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
দেশের বীজ খাতে একাধিক সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বীজের অঙ্কুরোদ্গমের সক্ষমতা, বিশুদ্ধতা, স্বাস্থ্যগত মান, লেবেলিং এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রয়োজনের সময় ও নির্ধারিত মৌসুমের আগে কৃষকের কাছে মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়াকেও বড় একটি বিষয় হিসেবে দেখছেন তিনি।
কম হারে বীজ প্রতিস্থাপন বা নতুন বীজ ব্যবহারের কারণে পুরোনো জাতের অবক্ষয় এবং রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও জানান বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক। তাই শুধু বীজের প্রাপ্যতা নয়, এর গুণগত মান এবং যথাযথ সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু ঝুঁকি রয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং পর্যাপ্তভাবে শুকানো না হওয়ায় বীজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় এসব বিষয় বিবেচনায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন খোরশেদ আলম।
আমদানিনির্ভর বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে বীজ আনতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, জাহাজীকরণ, ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদস্বাস্থ্যসংক্রান্ত অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব কারণে আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও দেশের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলে জানান তিনি। লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, জলমগ্নতা ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি নতুন ধরনের বা বাড়তি পোকামাকড়ের আক্রমণও বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে এমন জাতের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন খোরশেদ আলম। তাঁর মতে, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, জলমগ্নতা ও উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাতের বীজ উৎপাদন ও ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের কৃষি উৎপাদনকে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির সঙ্গে আরও বেশি মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!