যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬,৮ কার্তিক ১৪৩৩

ভাড়ার চার্ট নেই, ইচ্ছেমতো টাকা নিচ্ছে বাস

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ PM ৮০
ভাড়ার চার্ট নেই, ইচ্ছেমতো টাকা নিচ্ছে বাস

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ; ফাইল ছবি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে। নতুন ভাড়ার হার কার্যকর করে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। কিন্তু রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা না থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্ধারিত ভাড়া কত, তা যাত্রীদের অনেকেই নিশ্চিতভাবে জানতে না পারায় পরিবহনকর্মীদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে এই হার ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। আর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের মিনিবাসসহ ডিটিসিএ এলাকার নির্ধারিত জেলাগুলোর বাস ও মিনিবাসে ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে ১০ ও ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, অনেক পরিবহনে এই হিসাব অনুসরণ করা হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন পথে ১০ টাকার ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা এবং ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে আগের ভাড়ার তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে—এমন যুক্তি দেখালেও অনেক চালক বা পরিবহনকর্মী নতুন সরকারি ভাড়ার কোনো তালিকা দেখাতে পারেননি।

সাভার থেকে টেকনিক্যাল এলাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী এক যাত্রীর অভিযোগ, আগে যে পথে ২০ টাকা ভাড়া দিতে হতো, এখন সেখানে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সোমবার থেকেই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে এবং দূরত্বের তুলনায় এই বৃদ্ধি বেশি।

দূরপাল্লার পথেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সায়েদাবাদ-চুয়াডাঙ্গা রুটে রয়েল পরিবহনের নন-এসি বাসে আগে ৭০০ টাকা নেওয়া হলেও এখন ৮০০ টাকা নেওয়ার কথা জানা গেছে। এসি বাসে ৮০০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। গাবতলী থেকে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরগামী বাসে রুট ও পরিবহনভেদে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে আগে ভাড়া ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে।

ঢাকা-রংপুর রুটে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ভাড়া ৭১৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭৬৭ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন বাসে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে ঢাকা-খুলনা রুটে নির্ধারিত নতুন ভাড়া ৬২১ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও কোথাও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটেও আগের ৯০০ টাকার জায়গায় ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা রুটের একটি পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নন-এসি বাসে ১০০ টাকা এবং এসি বাসে ২০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তবে এই ভাড়া সরকারি নির্ধারিত হারের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো রুটভিত্তিক তালিকা কাউন্টারে পাওয়া যায়নি।

রাজশাহীতেও নতুন ভাড়ার তালিকা না পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার। সেখানে রাজশাহী-ঢাকা নন-এসি বাসে কোনো কোনো পরিবহন আগের ৭৩০ টাকাই নিচ্ছে। আবার কিছু এসি বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শ্যামলী পরিবহনের এক কাউন্টার ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, নতুন চার্ট না আসায় তাঁদের ভাড়া সমন্বয়ের কাজও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝিনাইদহ-ঢাকা রুটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী কিছু বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার কথা জানা গেছে। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটেও নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে ১০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহী-ঢাকা রুটের একটি লোকাল বাসে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মৌলভীবাজার-ঢাকা রুটে ৫৮০ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা এবং শ্রীমঙ্গল-সিলেট রুটেও নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে একটি পরিবহন আগের ভাড়ার সঙ্গে ৫০ টাকা যোগ করে যাত্রীপ্রতি ৭৫০ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, কিছু কাউন্টারে আরও বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এসি বাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। সরকার সাধারণত এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে না। বাসের ধরন, আসনসংখ্যা, সেবার মান ও পরিবহনভেদে ভাড়া নির্ধারিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর কিছু পরিবহন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। একই রুটে কাছাকাছি ধরনের বাসেও ভাড়ার পার্থক্য থাকায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুমের বক্তব্য, এসি বাসে সেবার মান ও সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য থাকায় সব পরিবহনের জন্য একই ভাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

এদিকে রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা দ্রুত প্রকাশের কথা জানিয়েছে বিআরটিএ। সংস্থাটির রুট পারমিট শাখার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মোরশেদুল আলম বলেছেন, দ্রুতই ওয়েবসাইটে বাসের বিস্তারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হবে। তালিকা প্রকাশে বিলম্ব হলে যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা প্রকাশে বিলম্বের কারণে প্রতিবছরই মাঠপর্যায়ে একই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। তাঁর প্রস্তাব, জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাসভাড়া সংশোধনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সরকার অবশ্য নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে টাকা আদায়ের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও বেশি নেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলে জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহনের রুট পারমিট বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বাসে ভাড়ার চার্ট না টাঙানো বা অনুমোদিত হারের বেশি ভাড়া নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিএনজির দাম না বাড়ায় সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোরও সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!