যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

নির্বাচনের মুখে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের পরিকল্পিত অপচেষ্টা

nayeemur7377

nayeemur7377

প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২২ PM | সর্বশেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ PM ২২২
নির্বাচনের মুখে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের পরিকল্পিত অপচেষ্টা

নির্বাচন সামনে রেখে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা। ছবি: সংগ্রহীত

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র টিকে থাকে কিছু বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর, যাদের প্রতি জনগণের আস্থা প্রশ্নাতীত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব, দুর্যোগে মানবিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে গৌরবোজ্জ্বল অবদান—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতীক।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা কারা করছে? এবং কেন ঠিক নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন অপচেষ্টা জোরালো হয়ে উঠেছে?

পতিত স্বৈরাচারী শাসনামলে কিছু উচ্চাভিলাষী ও কর্তৃত্বপরায়ণ কর্মকর্তার পেশাদারিত্ববহির্ভূত কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছিল—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এসব ছিল ব্যক্তিবিশেষের দায়, পুরো সেনাবাহিনীর নয়। ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট অনেকেই আইনের আওতায় এসেছেন।

তারপরও একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসে অবস্থানরত কিছু ইউটিউবার ও কথিত সাংবাদিক গত এক থেকে দেড় বছরে এমন একটি মিথ্যাচারের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।

কখনো বলা হয়েছে সেনাবাহিনী দেশ ধ্বংস করছে, কখনো সেনাপ্রধানকে বিদেশি গোয়েন্দাদের এজেন্ট আখ্যা দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো অভিযোগ তোলা হয়েছে—সেনাবাহিনী নাকি একটি নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে। এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, নেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগে ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ভিডিওতে দেখা যায়, গানম্যানসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশে বাধা পেয়ে তিনি দায়িত্বরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে বাক্‌বিতণ্ডায় জড়ান।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) স্পষ্ট করেছে—ঘটনাটি তখনই মীমাংসিত হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, মীমাংসিত একটি বিষয় নতুন করে উসকে দেওয়ার পেছনে কারা এবং কেন সক্রিয়?

ক্যান্টনমেন্টে নিয়ম ভাঙার সাহস সাধারণত কেউ দেখায় না—সে ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন। মিলিটারি পুলিশের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বিরল। ফলে ডা. খালিদুজ্জামানের আচরণ এবং পরবর্তী বক্তব্য একটি পরিচিত প্রোপাগান্ডা ভাষার প্রতিধ্বনি বলেই মনে হয়।

এই ন্যারেটিভের কৌশলগত লক্ষ্য পরিষ্কার—সেনাবাহিনীর সেই ঐতিহাসিক ‘লাস্ট আরবিট্রার’ ভূমিকার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। যে বৈধতার কারণেই রাজনৈতিক সংকটে সব পক্ষ শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

অন্যদিকে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে দেশজুড়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রায় এক লাখ সেনা মোতায়েন, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনী একটি আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্যান্টনমেন্টের ভিডিও কীভাবে প্রকাশ পেল, কারা এর পেছনে জড়িত—তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র আরও বাড়বে।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে তার চিরাচরিত পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আবারও প্রমাণ করতে হবে—এই বাহিনী কোনো দলের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়; এই বাহিনী কেবল বাংলাদেশের।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নির্বাচন ২০২৬ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!