যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

এআইয়ের চাপে কমছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ, আয় হারাচ্ছেন অনেকে

সাইফুল ইসলাম জয়

সাইফুল ইসলাম জয়

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ PM ৬৮
এআইয়ের চাপে কমছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ, আয় হারাচ্ছেন অনেকে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন টুলের ব্যবহার বাড়ায় বদলে যাচ্ছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রচলিত কাজের ধরন; ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতেও বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন। বিশেষ করে ডেটা এন্ট্রি, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন, গ্রাফিক ডিজাইন, ছবি সম্পাদনা ও সাধারণ কনটেন্ট তৈরির মতো তুলনামূলক সহজ কাজের ক্ষেত্রে বিদেশি ক্লায়েন্টদের নির্ভরতা কমছে। ফ্রিল্যান্সারদের কয়েকজনের অভিজ্ঞতায়, কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি কারও কারও আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সিং করা এমরাজিনা ইসলাম জানান, একটি বড় ক্লায়েন্ট হারানোর পর তাঁর আয় ৮০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ২০১২ সাল থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতেন তাঁরা। একসময় তাঁর টিমে ১৫ জন সদস্য ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্মীদের অফিস ও ল্যাপটপের সুবিধাও দিত। কোভিড মহামারির সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বাড়ায় টিমের সদস্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এআই ব্যবহারের বিস্তারের পর তাঁদের সেই কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

এমরাজিনার টিমে আগে গ্রাফিক ডিজাইন, ছবি সম্পাদনা ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনার কাজ করা হতো। তাঁর ভাষ্য, এসব কাজের অনেকটাই এখন এআই টুল দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। একই ধরনের পরিবর্তন ওয়েব ডেভেলপমেন্টেও দেখা যাচ্ছে। আগে যে কাজ শেষ করতে বড় টিম প্রয়োজন হতো, এখন কিছু ক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক মানুষ এআইয়ের সহায়তায় তা করতে পারছেন।

ফলে মৌলিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ফ্রিল্যান্সাররা তুলনামূলক বেশি চাপে পড়ছেন বলে মনে করেন এমরাজিনা। তাঁর মতে, সাধারণ কনটেন্ট লেখা, ছবি সম্পাদনা কিংবা ডেটা এন্ট্রির মতো কাজের বাজারে আগের পরিস্থিতি আর নেই। এআই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন না করলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।

ফ্রিল্যান্সিং বাজারের এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু একটি কাজের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় দুই দশক ধরে ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত ইউসুফ তুষার জানান, এআই দিয়ে তৈরি ছবির কারণে বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফির চাহিদা কমেছে। আগে পণ্য, মডেল কিংবা স্টক ছবির জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ফটোগ্রাফারের সেবা নিত। এখন অনেক কোম্পানি শুটিং ছাড়াই এআইয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ছবি তৈরি করছে। তাঁর হিসাবে, এতে তাঁর আয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

ঢাকার ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুনও বাজারে পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। প্রায় ১৪ বছর ধরে এ পেশায় থাকা মামুনের মতে, কাজের সুযোগ কমার পাশাপাশি অবশিষ্ট কাজের জন্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তাঁর নিজের কাজ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে দীর্ঘদিনের সরাসরি ক্লায়েন্ট থাকায় তিনি পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারছেন।

মামুনের পাঁচ সদস্যের টিমও এখন শুধু আপওয়ার্ক বা ফাইভারের মতো আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করছে না। বরং সরাসরি ক্লায়েন্ট খোঁজার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, অনেক ফ্রিল্যান্সারের কাজ অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কারও ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ছোটখাটো প্রকল্পের জন্য ক্লায়েন্টরা আগের মতো ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ না করে নিজেরাই এআই ব্যবহার করে কাজ করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।

তবে এআইয়ের কারণে কাজের একটি অংশ কমলেও নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আপওয়ার্কের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্ল্যাটফর্মটিতে এআই-সম্পর্কিত কাজ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ বেড়েছিল ৫২ শতাংশ। এআই-ভিত্তিক কাজ করা ফ্রিল্যান্সাররা সাধারণ কাজ করা ফ্রিল্যান্সারদের তুলনায় গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরেকটি দিকও রয়েছে। দেশের অনেক ফ্রিল্যান্সার এখনো তুলনামূলক প্রাথমিক পর্যায়ের কাজের ওপর নির্ভরশীল। এআই এসব কাজের একটি বড় অংশ দ্রুত করতে পারায় এই শ্রেণির কর্মীদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরের মতে, বৈশ্বিক সেবা খাত দ্রুত এআইনির্ভর হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশকে দ্রুত গুরুত্ব দিতে হবে।

এমরাজিনা ইসলামও মনে করেন, ভবিষ্যতে শুধু প্রচলিত দক্ষতা দিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যৌক্তিক চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (বিএফডিএস) চেয়ারম্যান তানজিবা রহমানের বক্তব্যেও প্রশিক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে ফ্রিল্যান্সিং বাজার দ্রুত বদলালেও দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সমান গতিতে এগোতে পারছে না। বর্তমানে প্রশিক্ষণের বড় অংশই এন্ট্রি-লেভেল দক্ষতা তৈরিতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বাজারের নতুন চাহিদার সঙ্গে ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এআই একদিকে প্রচলিত ছোট ও সহজ ডিজিটাল কাজের চাহিদা কমাচ্ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তিত বাজারে টিকে থাকার জন্য ফ্রিল্যান্সারদের এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফ্রিল্যান্সিং কনটেন্ট ট্রান্সক্রিপশন গ্রাফিক ডিজাইন এমরাজিনা এআই টুল এআই আপওয়ার্ক প্রযুক্তি বিএফডিএস

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!