যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬,৮ কার্তিক ১৪৩৩

এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনশন

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৮ PM ৪৫
এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনশন

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণঅনশন ও বিক্ষোভ করেছেন বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ, কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বন্দর পরিচালনার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৯ অক্টোবর ফের অনশনে বসার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের কাস্টমস ভবনের বিপরীতে বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনসংলগ্ন এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ, জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক নেতা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত ৮ অক্টোবর বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা না করে এবং জনমতের যথাযথ প্রতিফলন ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। তাদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার পরিচালনভার দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য সুফল এবং কর্মীদের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

গণঅনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারের যুক্তি ও পরিকল্পনা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। টার্মিনাল আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও সেই উন্নয়ন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইব্রাহিম খোকনের বক্তব্য, শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলেই আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার সব জটিলতা দূর হবে না। আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে জটিলতা এবং বন্দরের আশপাশের সড়কে যানজটের মতো সমস্যাগুলোরও সমাধান জরুরি। এসব ক্ষেত্রে বন্দর পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কার্যক্রম ও সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বন্দর পরিচালনার সময় ও আমদানি পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক থেকে তিন হাজার কনটেইনার বহনকারী একটি জাহাজ থেকে পণ্য নামানো এবং নতুন কনটেইনার বোঝাই করে জাহাজটি বন্দর ছাড়তে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগতে পারে। তবে আমদানি করা পণ্য গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর সময় শুল্কায়ন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। ফলে এ সময়সীমাকে শুধু টার্মিনাল পরিচালনার দক্ষতা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয় বলে তার মত।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে জোয়ার-ভাটার প্রভাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের এই সমন্বয়ক। তার মতে, টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বদলালেই বন্দরের সব সীমাবদ্ধতা দূর হবে না; বরং অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও লজিস্টিকস খাতের সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

অনশনে অংশ নেওয়া শ্রমিক নেতাদের প্রধান উদ্বেগের একটি হলো কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ। তাদের অভিযোগ, ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব গেলে বর্তমানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের ধরন, চাকরির স্থায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে চুক্তিতে যথেষ্ট স্পষ্টতা নেই। বন্দরের বর্তমান অবস্থান তৈরিতে শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, কর্মীদের জীবিকা সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিক্ষোভকারীরা বন্দর পরিচালনার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ও জড়িত বলে দাবি করেন। তাদের বক্তব্য, আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকলে চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সম্ভাব্য সুবিধা এবং কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আনা উচিত। তারা দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বাতিল করে বর্তমান কাঠামো অথবা দক্ষ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বন্দর পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, সরকারের যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়তে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় বিনিয়োগের বিষয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চুক্তির স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ এখনো রয়েছে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!