যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬,৮ কার্তিক ১৪৩৩

মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা, কমছে প্রকৃত আয়

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ PM ৭৭
মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা, কমছে প্রকৃত আয়

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি। কারণ, পণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, আয় বাড়ছে তার চেয়েও কম হারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশে।

আগস্টের মূল্যস্ফীতি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা ধীরগতিতে বাড়লেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না সীমিত ও নিম্নআয়ের মানুষ।

সহজ হিসাবে, গত বছরের আগস্টে কোনো পণ্য ও সেবার একটি নির্দিষ্ট ঝুড়ি কিনতে ১০০ টাকা খরচ হলে চলতি বছরের একই সময়ে তা কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা প্রয়োজন হয়েছে। বিপরীতে, গত বছর ১০০ টাকা আয় করা একজনের আয় বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ৫ পয়সা। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় সামান্য বেশি হারে বেড়েছে।

এই ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরে চলায় মানুষের প্রকৃত আয় বা মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর হাতে থাকা আয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বাড়তি খরচ সামাল দিতে কেউ প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাচ্ছেন, কেউ সঞ্চয় ব্যবহার করছেন। যাদের সঞ্চয় নেই, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হানের মতে, মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি মজুরি সূচক বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান প্রবণতায় মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আয় বাড়লেও বাজারের বাড়তি খরচ সেই বৃদ্ধির বড় অংশ গ্রাস করে ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানও বাজারদরের চাপের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, নিত্যপণ্যের দাম এখনো চড়া। গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যয়ও মানুষের খরচ বাড়াচ্ছে। বোরো ধানের মৌসুম শেষ হওয়ার পরও চালের দাম প্রত্যাশিতভাবে কমেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে বাজার তদারকি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধানটি নতুন নয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকে মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতিই বেশি ছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। ওই সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় ৮ শতাংশের আশপাশেই ছিল।

২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি অর্থবছরের শুরুতে জুলাইয়ে তা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে জুলাইয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে আগস্টে আরও কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমেছে।

এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের ওপর। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। গ্রামে এ হার প্রায় ৮৮ শতাংশ এবং শহরে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

বিবিএস কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, জেলে, দিনমজুর ও নির্মাণশ্রমিকসহ ৪৪ ধরনের পেশার তথ্য নিয়ে মজুরি সূচক তৈরি করে। আগস্টে শিল্প খাতে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ, সেবা খাতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।

তবে মজুরি সূচকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে পুরো শ্রমবাজারের সব কর্মী ও চাকরিজীবীর আয় প্রতিফলিত হয় না। তুলনামূলক উচ্চ আয়ের বেতনভোগী ও বিভিন্ন পেশাজীবী এই সূচকের আওতার বাইরে থাকায় মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব এই পরিসংখ্যান দিয়ে সরাসরি বোঝা যায় না।

ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সাম্প্রতিক প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি না বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল সীমিত থাকতে পারে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল শ্রমশক্তির আয় যদি বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!