গল্পের আলোকে প্রতীকী ছবি ।
গ্রামের মানুষ আজও সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়। কারণ গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে একটি শতবর্ষী বরই গাছ দাঁড়িয়ে আছে। দিনের আলোতে গাছটি সাধারণ মনে হলেও রাত নামলেই সেটিকে ঘিরে নেমে আসে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। পাখিরা সেখানে বসে না, কুকুর কাছে যায় না, এমনকি বাতাসও যেন সেই গাছের পাশ দিয়ে বইতে ভয় পায়।
এই অভিশপ্ত গাছের গল্পই জানত না রাইশা।
রাইশা ছিল অপূর্ব সুন্দরী। দুধের মতো ফর্সা গায়ের রং, হাঁটু ছুঁয়ে যাওয়া ঘন কালো চুল, বড় বড় মায়াবী চোখ—যে-ই একবার তাকে দেখত, তাকিয়ে থাকত। পড়াশোনায়ও সে ছিল অসাধারণ মেধাবী। সবাই বলত, এমন মেয়ে নাকি লাখে একজন জন্মায়।
গ্রীষ্মের ছুটিতে সে মায়ের সঙ্গে ফুপ্পির গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এল। চারদিকে সবুজ প্রকৃতি, পুকুর, বাঁশঝাড় আর সেই বিশাল বরই গাছ। দুপুর হলেই রাইশা বরই পাড়তে চলে যেত।
প্রথম দিন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সে শুনতে পেল, খুব আস্তে কেউ যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
সে ভাবল হয়তো বাতাসের শব্দ।
হঠাৎ তার কাঁধে ঠান্ডা কিছু স্পর্শ করল।
পেছনে তাকিয়ে কাউকে পেল না।
দ্বিতীয় দিন বরই তুলতে গিয়ে সে দেখতে পেল, গাছের গায়ে নখ দিয়ে আঁচড় কাটা। আঁচড়গুলো দেখে মনে হচ্ছিল কেউ মরার আগে প্রাণপণে গাছ আঁকড়ে ধরেছিল।
তৃতীয় দিন...
একটি পাকা বরই মাটিতে পড়ল।
রাইশা সেটি তুলতে নিচু হতেই তার কানের কাছে একটি ফিসফিস আওয়াজ—
**"আমার দিকে তাকাও..."**
সে চমকে উঠে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
কিন্তু গাছের ওপরে দুই জোড়া লাল চোখ তাকে দেখছিল।
চোখের পলক ফেলতেই অদৃশ্য।
সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের পুকুরঘাটে বসে ছিল রাইশা।
হঠাৎ...
ঝন... ঝন... ঝন...
নূপুরের শব্দ।
কিন্তু আশেপাশে কোনো মানুষ নেই।
তারপর আবার—
**"রাইশা..."**
এবার স্পষ্ট।
কেউ ঠিক তার কানের পাশে দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডাকল।
সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল...
পুকুরের মাঝখানে সাদা কাপড় পরা লম্বা চুলের এক নারী দাঁড়িয়ে আছে।
পানি তার হাঁটু পর্যন্তও নয়।
সে পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু চুল।
হঠাৎ ধীরে ধীরে মাথা কাত করল।
তারপর অস্বাভাবিক গতিতে পুকুরের নিচে ডুবে গেল।
সেই রাত থেকেই রাইশার ঘুম উধাও।
রাত তিনটার দিকে তার ঘুম ভেঙে গেল।
ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে।
এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ।
ধীরে ধীরে সেই ছায়া এগিয়ে এল।
তার লম্বা চুল মেঝে ঘষে এগোচ্ছে।
হঠাৎ...
ছায়াটি নেই।
রাইশা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
ঠিক তখনই সে অনুভব করল—
তার বিছানার নিচে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
খরর...
খরর...
খরর...
সে নিচে তাকানোর সাহস পেল না।
ভোর পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে কাঁদতে থাকল।
পরদিন সকালে তার পায়ের গোড়ালিতে পাঁচটি কালো আঙুলের দাগ দেখা গেল।
কেউ যেন শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
রাত বাড়তেই রাইশা বদলে যেতে লাগল।
সে একা একা কথা বলত।
ফাঁকা ঘরে তাকিয়ে হাসত।
মাঝরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে বরই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকত।
পরিবার তাকে জিজ্ঞেস করলে সে কিছুই মনে করতে পারত না।
এক রাতে তার মা ঘুম ভেঙে দেখলেন—
রাইশা ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
কিন্তু...
ওটা রাইশার চোখ ছিল না।
দুটি সম্পূর্ণ কালো চোখ।
এক ফোঁটা সাদা অংশও নেই।
সে হাসতে হাসতে বলল,
**"আর মাত্র তিন রাত..."**
পরদিন গ্রামের বৃদ্ধরা বললেন,
"বরই গাছের অতৃপ্ত আত্মা কাউকে পছন্দ করলে সাত রাতের আগে ছাড়ে না।"
সপ্তম রাত।
আকাশে চাঁদ নেই।
হঠাৎ পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
দরজা নিজের থেকেই খুলে গেল।
নূপুরের শব্দ চারদিক থেকে ভেসে আসতে লাগল।
ঝন...
ঝন...
ঝন...
রাইশা বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তারপর এমনভাবে শরীর বাঁকতে লাগল, যেন মানুষের হাড়ের নিয়ম মানছে না।
মুখ ওপরে।
হাত পেছনে।
চুল মাটিতে লুটিয়ে।
হঠাৎ সে মাটির ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে এগোতে লাগল।
তার মা চিৎকার করে তাকে ধরতে গেলে রাইশা এক ঝটকায় তাকে দূরে ফেলে দিল।
তার কণ্ঠ আর মানুষের মতো নেই।
গভীর, কর্কশ, অচেনা।
**"ও এখন আমার..."**
পরিবারের সবাই আতঙ্কে একজন অভিজ্ঞ হুজুরকে নিয়ে এলেন।
হুজুর ঘরে ঢুকেই বললেন,
"কেউ ভয় পাবেন না। সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।"
তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত শুরু করলেন।
আয়াত পড়া শুরু হতেই রাইশা প্রচণ্ড চিৎকার করতে লাগল।
ঘরের বাতি বারবার নিভে জ্বলতে লাগল।
জানালাগুলো প্রচণ্ড শব্দে খুলে-বন্ধ হতে লাগল।
একসময় রাইশার মুখ দিয়ে অন্য কণ্ঠ ভেসে এলো—
**"এই গাছ আমার... যে এর ফল নেয়, সে আমার..."**
হুজুর তিলাওয়াত চালিয়ে গেলেন।
দীর্ঘ সময় পর রাইশা জোরে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
সবকিছু শান্ত হয়ে গেল।
কিন্তু...
পরদিন ভোরে গ্রামের এক বৃদ্ধ বললেন,
গত রাতে তিনি বরই গাছের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছেন—
গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে লম্বা চুলওয়ালা একটি ছায়া বসে ছিল।
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকটি মেয়ে...
যার চুল হাঁটু ছুঁয়ে গেছে...
মুখটা ঠিক রাইশার মতো।
আজও গ্রামের মানুষ বলে, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যদি কেউ সেই বরই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের নাম তিনবার বলে...
তাহলে অন্ধকারের ভেতর থেকে কারও ফিসফিসানি শোনা যায়।
আর যদি নূপুরের শব্দ শুনতে পাও...
তাহলে কখনোই পেছনে ফিরে তাকিয়ো না।
কারণ...
পেছনে যে দাঁড়িয়ে থাকে...
সে মানুষ নয়।
গল্প অভিশাপ
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!