গল্পের আলোকে চিত্র ।
বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম চরনদী। গ্রামের এক পাশে বয়ে গেছে ছোট্ট নদী, অন্য পাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত। বর্ষায় নদীর পানি উপচে পড়ত, শীতকালে মাঠজুড়ে শিশির জমত। সেই গ্রামের মাটির দেয়াল আর টিনের চালের একটি ছোট্ট ঘরে বাস করত আরিফ নামের এক ছেলে। তার বাবা আবদুল কাদের ছিলেন একজন দিনমজুর, আর মা রহিমা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের অভাব মেটানোর চেষ্টা করতেন।
তাদের সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। কখনো রান্নার হাঁড়িতে ভাত থাকত, কখনো থাকত শুধু লবণ-মরিচ দিয়ে মাখানো ভাত। ঈদের সময় নতুন জামা কেনার সামর্থ্য হতো না। তবু আরিফের চোখে ছিল এক অদ্ভুত আলো। সে আলো কোনো ধনসম্পদের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেয়নি; জন্ম নিয়েছিল দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে।
আরিফের বয়স তখন মাত্র সাত বছর। একদিন গ্রামের পাশের সড়ক দিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি যাচ্ছিল। গাড়িগুলোর গায়ে বাংলাদেশের পতাকা আঁকা, আর ভেতরে বসা সেনাসদস্যদের পরনে জলপাই রঙের পোশাক। তাদের দৃঢ় চেহারা, সুশৃঙ্খল চলাফেরা আর আত্মবিশ্বাসী চোখ দেখে আরিফ মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেদিন রাতে মায়ের পাশে শুয়ে সে প্রশ্ন করল, “মা, সেনাবাহিনীর মানুষগুলো কী করে?”
মা মৃদু হেসে বললেন, “তারা আমাদের দেশকে রক্ষা করে, বাবা। দেশের মানুষ যেন নিরাপদে ঘুমাতে পারে, সে জন্য তারা দিনরাত দায়িত্ব পালন করে।”
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মায়ের হাত ধরে বলল, “মা, আমি বড় হয়ে সেনাবাহিনীর অফিসার হব। দেশের জন্য কাজ করব। বাংলাদেশের পতাকাকে পৃথিবীর সব জায়গায় সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরব।”
মা ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বললেন, “স্বপ্ন দেখা সহজ, বাবা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়।”
আরিফ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, “আমি কষ্টকে ভয় পাব না, মা।”
সেদিন ছোট্ট ছেলেটির মনে যে স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা শিকড় ছড়িয়ে দিল তার হৃদয়ের গভীরে।
দিন গড়িয়ে বছর এল। আরিফ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। তার বইয়ের মলাট ছেঁড়া ছিল, স্কুলব্যাগটি ছিল পুরোনো, আর জুতোর তলা প্রায়ই খুলে যেত। তবু সে কখনো পড়াশোনায় অবহেলা করত না।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে বাবাকে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করত। তারপর নদীর ঘাট থেকে পানি এনে, মায়ের ছোটখাটো কাজে হাত লাগিয়ে স্কুলে যেত। স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার বদলে কখনো বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করত, কখনো বাজারে ছোটখাটো কাজ করে সংসারে সামান্য টাকা জোগাড় করত।
রাতে যখন গ্রামের অন্য ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়ত, তখন কেরোসিনের বাতির নিচে বসে আরিফ বই খুলে পড়ত। বাতির আলো কমে এলে সে বইয়ের পাতা জানালার কাছে নিয়ে যেত, যেন বাইরের চাঁদের আলোয় কিছুটা পড়তে পারে।
একদিন তার বাবা কাজ থেকে ফিরে দেখলেন, আরিফ পুরোনো একটি বইয়ের পাতায় সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন কর্মকর্তার ছবি দেখছে।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাবা, আমাদের তো তেমন টাকা-পয়সা নেই। এত বড় স্বপ্ন পূরণ করতে অনেক পড়াশোনা, প্রস্তুতি আর খরচ লাগবে।”
আরিফ বইটি বন্ধ করে বাবার দিকে তাকাল।
“বাবা, টাকা কম থাকতে পারে, কিন্তু চেষ্টা তো কম নয়। আমি নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে চাই।”
ছেলের কথা শুনে আবদুল কাদেরের চোখ ভিজে উঠল। তিনি জানতেন, দারিদ্র্য মানুষের অনেক স্বপ্নকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। কিন্তু ছেলের চোখে যে আগুন তিনি দেখলেন, তা সহজে নিভে যাওয়ার নয়।
সেই দিন থেকে বাবা ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে আরও সচেতন হলেন। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে হলেও ছেলের খাতা-কলম কেনার চেষ্টা করতেন।
অভাব তাদের ঘরের দরজায় প্রতিদিন কড়া নাড়ত, কিন্তু আরিফের স্বপ্নের দরজা বন্ধ করতে পারত না।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার পর আরিফের সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠল। স্কুলটি বাড়ি থেকে বেশ দূরে ছিল। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে তাকে স্কুলে যেতে হতো। বর্ষার দিনে কাদা মাড়িয়ে, কখনো হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে সে ক্লাসে পৌঁছাত।
একদিন স্কুলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
কেউ বলল ডাক্তার হবে, কেউ বলল প্রকৌশলী, কেউ ব্যবসায়ী। আরিফ দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আমি সেনাবাহিনীর একজন অফিসার হতে চাই।”
ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র হেসে উঠল।
একজন বলে উঠল, “তুই? তোর তো ভালো জুতাও নেই! সেনাবাহিনীর অফিসার হবি কীভাবে?”
আরেকজন বলল, “আগে নিজের সংসারের অবস্থা দেখ, তারপর এত বড় স্বপ্ন দেখিস!”
কথাগুলো আরিফের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধল। সে কিছু বলল না। মাথা নিচু করে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফিরে সে কাঁদেনি। বরং পুরোনো খাতার প্রথম পাতায় লিখেছিল—
“আমার পরিচয় আমার দারিদ্র্য নয়। আমার পরিচয় হবে আমার পরিশ্রম, সততা ও দেশপ্রেম।”
তার শিক্ষক মজিবর স্যার একদিন তাকে ডেকে বললেন, “আরিফ, মানুষের হাসি শুনে নিজের পথ বদলাবে না। মনে রেখো, বড় স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হয় না; নিয়মিত পড়াশোনা, শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা আর মানসিক দৃঢ়তাও প্রয়োজন।”
স্যারের কথাগুলো আরিফ হৃদয়ে গেঁথে নিল।
সেই থেকে সে নিজের জীবনকে নিয়মের মধ্যে আনতে শুরু করল। প্রতিদিন সকালে দৌড়াত, শরীরচর্চা করত, পড়াশোনার জন্য সময় ভাগ করে নিত। স্কুলের পড়ার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করত। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, সে বিষয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে জানত।
তার কাছে প্রতিটি সকাল ছিল নতুন সুযোগ, প্রতিটি রাত ছিল নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সময়।
আরিফ যখন নবম শ্রেণিতে পড়ে, তখন তার বাবা একদিন কাজ করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দীর্ঘদিন ভারী কাজ করার কারণে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল। সংসারের প্রধান উপার্জনকারী মানুষটি বিছানায় পড়ে যাওয়ায় পরিবারে নেমে এল গভীর সংকট।
মায়ের একার উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠল। বাজারের বাকি বাড়তে লাগল, ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করা দায় হয়ে পড়ল।
আরিফের সামনে তখন দুটি পথ ছিল—পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে যাওয়া, অথবা সব কষ্টের মধ্যেও নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে থাকা।
কয়েক রাত সে ঘুমাতে পারেনি। বাবার কাশির শব্দ আর মায়ের চাপা কান্না তার বুক ভারী করে তুলত। এক রাতে সে মাকে বলল, “মা, আমি যদি পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করি, তাহলে কিছু টাকা আয় করতে পারব।”
মা ছেলের মুখে হাত রেখে বললেন, “সংসারের কষ্ট আমরা সামলাব। তুই যদি এখন নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিস, তাহলে এত দিনের পরিশ্রমের কী হবে? তোর বাবা চায় তুই মানুষ হ।”
মায়ের চোখে জল ছিল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা।
আরিফ সিদ্ধান্ত নিল, সে পড়াশোনা ছাড়বে না। স্কুলের পর যতটুকু সম্ভব কাজ করবে, আর রাতে পড়বে। কখনো বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিত, কখনো পরিচিত এক দোকানদারকে হিসাব লিখতে সাহায্য করত। বিনিময়ে যে সামান্য টাকা পেত, তা দিয়ে নিজের খরচ চালাত।
পরীক্ষার আগে অনেক রাত সে ঘুমাতে পারেনি। ক্লান্ত চোখে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, তবু হাল ছাড়েনি।
মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আরিফ জানতে পারল, সে ভালো ফল করেছে। খবরটি শুনে তার মা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। অসুস্থ বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “তুই শুধু আমার ছেলে নোস, বাবা। তুই আমার ভরসা।”
সেদিন আরিফ বুঝল, নিজের স্বপ্ন পূরণ করা মানে শুধু নিজের জন্য কিছু অর্জন করা নয়; কখনো কখনো একটি পরিবারের আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখাও।
মাধ্যমিকের পর আরিফ কলেজে ভর্তি হলো। সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তাকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু অর্থের অভাব তখনো পিছু ছাড়েনি।
কলেজের বেতন, বই কেনা, যাতায়াত—সবকিছু সামলাতে তাকে অনেক হিসাব করে চলতে হতো। পুরোনো বই সংগ্রহ করত, বন্ধুদের কাছ থেকে নোট নিত, আর অবসর সময়ে ছোটদের পড়াত।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সময়ের সঠিক ব্যবহার। সে জানত, সুযোগ হয়তো বারবার আসবে না। তাই প্রতিটি দিনকে কাজে লাগাতে হবে।
কলেজের এক শিক্ষক তাকে সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে জানালেন। বিজ্ঞপ্তিটি হাতে নিয়ে আরিফের হাত কেঁপে উঠল। বহু বছরের স্বপ্ন যেন কাগজের কয়েকটি লাইনে বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু আবেদন করা থেকে শুরু করে নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ পার হওয়া সহজ ছিল না। তাকে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলো।
সে নিয়মিত পড়াশোনা করল, দৌড় ও শরীরচর্চার অভ্যাস বজায় রাখল এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করল। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করত।
আবেদনের দিন মা তার জন্য সামান্য খাবার গুছিয়ে দিলেন।
মা বললেন, “আল্লাহর ওপর ভরসা রাখিস। আর নিজের চেষ্টা কখনো বন্ধ করিস না।”
আরিফ মায়ের হাত ছুঁয়ে বলল, “আমার জন্য দোয়া কোরো, মা। একদিন তোমাদের সব কষ্টের মর্যাদা রাখতে চাই।”
সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার কাছে দামি পোশাক ছিল না, বড় কোনো পরিচয়ও ছিল না। ছিল শুধু নিজের যোগ্যতায় কিছু করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছা।
নির্বাচনের দিন আরিফ ভোরে ঘুম থেকে উঠল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা। চারপাশের সবকিছু যেন পরিচিত হয়েও নতুন লাগছিল।
নির্বাচনের বিভিন্ন ধাপে তাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হলো। কোথাও জ্ঞানের পরীক্ষা, কোথাও শারীরিক সক্ষমতা, কোথাও মানসিক দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের মূল্যায়ন। প্রতিটি ধাপেই সে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করল।
তার আশপাশে ছিল শহরের নামী প্রতিষ্ঠানে পড়া অনেক শিক্ষার্থী। কারও প্রস্তুতির সুযোগ বেশি ছিল, কারও কাছে ছিল আধুনিক বই আর প্রশিক্ষণের সুবিধা। আরিফের কাছে এসবের কিছুই ছিল না। তবু সে নিজেকে ছোট ভাবেনি।
সে মনে মনে বলেছিল, “আমি অন্য কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে আসিনি। আমি এসেছি নিজের সামর্থ্যের সেরাটা দিতে।”
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফল প্রকাশিত হলো।
প্রথমবার নিজের নাম তালিকায় দেখে আরিফ বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে আবার নামটি পড়ল, তারপর আরেকবার। চোখের সামনে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে এল।
সে নির্বাচিত হয়েছে।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল। তারপর তার বুক থেকে বেরিয়ে এল আনন্দে ভরা এক দীর্ঘ নিশ্বাস।
সে প্রথমে মাকে ফোন করল।
“মা, আমি পেরেছি! আমি সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছি!”
ওপাশ থেকে মায়ের কান্নার শব্দ ভেসে এল।
“আলহামদুলিল্লাহ, বাবা! আল্লাহ তোর পরিশ্রম কবুল করেছেন।”
বাবা ফোনটি হাতে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “আজ আমার সব কষ্ট সার্থক হলো।”
আরিফ আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ল সেই ছোট্ট গ্রামের রাস্তা, ছেঁড়া জুতো, কেরোসিনের বাতি, সহপাঠীদের উপহাস আর মায়ের নির্ঘুম রাতগুলো।
সে জানত, এটি তার স্বপ্নের শেষ নয়। বরং সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের শুরু।
সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পৌঁছে আরিফ বুঝল, স্বপ্নের পথ কল্পনার চেয়ে অনেক কঠিন।
এখানে প্রত্যেকটি দিন ছিল পরীক্ষা। ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে ওঠা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুত হওয়া, শারীরিক প্রশিক্ষণ, পড়াশোনা, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা—সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মে চলত।
প্রথম কয়েক দিন তার শরীর যেন নিজের সঙ্গে লড়াই করছিল। দীর্ঘ সময়ের প্রশিক্ষণে ক্লান্তি এসে ভর করত। পেশিতে ব্যথা হতো, ঘুম পেত, বাড়ির কথা মনে পড়ত। গ্রামের ছোট্ট ঘরটির কথা মনে হলে তার মন ভারী হয়ে উঠত।
সবচেয়ে কঠিন ছিল নিজের দুর্বলতাকে মেনে নিয়ে প্রতিদিন আবার নতুন করে চেষ্টা করা।
একদিন প্রশিক্ষণের পর অন্যদের সঙ্গে বসে খাবার খেতে খেতে তার মায়ের কথা মনে পড়ল। বাড়িতে কখনো পর্যাপ্ত খাবার জুটত না, অথচ এখানে খাবারের প্রতিটি অংশ ছিল নিয়ম ও প্রয়োজনের হিসাব অনুযায়ী নির্ধারিত। সে উপলব্ধি করল, শৃঙ্খলা শুধু পোশাকে বা আদেশ মানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিজের শরীর, সময় ও দায়িত্বের প্রতিও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশিক্ষণে ভুল করলে সংশোধন করতে হতো। সময়ের মূল্য বুঝতে হতো। নিজের পাশাপাশি সহযোদ্ধাদের কথাও ভাবতে হতো। কোনো কাজে একজন পিছিয়ে পড়লে অন্যদের দায়িত্ব ছিল তাকে সহযোগিতা করা, যাতে পুরো দল একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।
এক রাতে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আরিফ ভাবছিল, সে কি সত্যিই পারবে?
ঠিক তখনই বাবার কথাটি মনে পড়ল—“তুই আমার ভরসা।”
মায়ের কণ্ঠও যেন কানে বাজল—“নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিস না।”
আরিফ চোখ বন্ধ করল। পরদিন ভোরে সে আবার উঠে দাঁড়াল।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, সে নিজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে শিখল। শারীরিক শক্তির পাশাপাশি তার মধ্যে গড়ে উঠল ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ এবং দলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলার মানসিকতা।
প্রশিক্ষণের শেষ দিকে এক কর্মকর্তা তাদের বলেছিলেন, “একজন সেনা কর্মকর্তার পরিচয় শুধু তার পোশাকে নয়। তার পরিচয় তার সততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, অধীনস্থদের প্রতি দায়িত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারে।”
আরিফ কথাগুলো মনে গেঁথে নিল।
অবশেষে সেই দিন এল, যেদিন সে সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করল। আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে দাঁড়ানোর সময় তার মনে হচ্ছিল, এই পোশাকের প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে বহু বছরের ত্যাগ।
তার চোখে জল এসেছিল। কিন্তু সেটি দুঃখের জল নয়—ছিল সংগ্রাম পেরিয়ে অর্জনের আনন্দ।
প্রশিক্ষণ শেষে আরিফ পেল তার কর্মজীবনের প্রথম দায়িত্ব। নতুন পরিবেশ, নতুন সহকর্মী, নতুন চ্যালেঞ্জ—সবকিছুই ছিল অচেনা। কিন্তু এবার তার ভেতরে আর আগের সেই দ্বিধা ছিল না।
সে জানত, দায়িত্ব পাওয়া মানে শুধু একটি পদ পাওয়া নয়; মানুষের বিশ্বাসের যোগ্য হয়ে ওঠা।
সে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে লাগল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে চলা, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা, নিজের অধীনস্থ সদস্যদের কথা শোনা—এসবকে সে গুরুত্ব দিত।
একদিন দায়িত্ব পালনের ফাঁকে তার এক সহকর্মী জানতে চাইল, “তোমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা কী?”
আরিফ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “আমার মা-বাবা। আর সেই গ্রামের মানুষগুলো, যারা হয়তো কখনো ভাবেনি যে তাদের মতো একটি দরিদ্র পরিবারের ছেলে একদিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হতে পারবে।”
সহকর্মীটি হাসল। আরিফও হাসল।
কিন্তু তার মনে তখন অন্য এক চিন্তা। যে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সে বড় হয়েছে, সেই দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করার সুযোগ পাওয়া তার কাছে ছিল বিরাট সৌভাগ্য।
কোনো দায়িত্বকে সে ছোট করে দেখত না। তার বিশ্বাস ছিল, বড় দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তৈরি হয় ছোট ছোট দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করার মধ্য দিয়ে।
বছর গড়াতে লাগল। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আরিফের দক্ষতাও বাড়ল। সে বুঝতে শিখল, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; বরং ভয় বা অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বিবেচনা, প্রশিক্ষণ ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে সঠিক কাজটি করা।
কয়েক বছর পর আরিফের সামনে এল নতুন এক সুযোগ। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে মনোনীত করা হলো।
খবরটি শুনে তার বুক গর্বে ভরে উঠল। ছোটবেলায় যে স্বপ্ন সে দেখেছিল—দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালন করবে—সেই স্বপ্ন যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এল।
মিশনে যাওয়ার আগে সে বাড়িতে এল। অনেক দিন পর মায়ের সামনে বসে নিজের ছোটবেলার কথা মনে করল। সেই কেরোসিনের বাতি, পুরোনো বই, বৃষ্টিতে ভেজা পথ—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মা তার পোশাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই যখন ছোট ছিলি, তখন বলতিস দেশের জন্য কাজ করবি। আজ তোর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।”
আরিফ মায়ের হাত ধরে বলল, “মা, এটা শুধু আমার অর্জন নয়। তোমাদের ত্যাগ ছাড়া আমি এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।”
বাবা ধীর কণ্ঠে বললেন, “দেশের সম্মান যেন সব সময় রক্ষা করিস। মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখিস।”
আরিফ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
বিদায়ের দিন বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সে বাংলাদেশের পতাকার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই ছোট্ট পতাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের আশা, ইতিহাস, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়।
বিদেশের মাটিতে পৌঁছে সে উপলব্ধি করল, দেশের বাইরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব কত বড়। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যে তাকে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিকতা বজায় রেখে কাজ করতে হতো।
শান্তিরক্ষা মিশনে তার দায়িত্ব ছিল নির্ধারিত এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় মিশনের নিয়ম অনুযায়ী কাজ করা এবং অন্যান্য দেশের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় রাখা।
একদিন দায়িত্ব পালনের সময় সে দেখল, সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকায় অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একটি ছোট ছেলে দূর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। ছেলেটির চোখে ছিল ভয় আর অসহায়তা।
আরিফের নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। দারিদ্র্যের কারণে সে জানত, একটি শিশুর কাছে নিরাপদে ঘুমাতে পারা, নিয়মিত খাবার পাওয়া আর নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারার মূল্য কতখানি।
সে উপলব্ধি করল, শান্তিরক্ষা শুধু দায়িত্বের একটি অংশ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ।
সেদিন রাতে ডায়েরিতে সে লিখল—
“পৃথিবীর মানচিত্রে দেশগুলোর সীমানা আলাদা হতে পারে, ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা একই। একজন সৈনিকের দায়িত্ব শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; শান্তি, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার পক্ষে নিজের কর্তব্য পালন করা।”
মিশনে সে বিভিন্ন দেশের সেনাসদস্যদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেল। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখল, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যোগাযোগ ও সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে তার দেশের সুনাম বজায় রাখার চেষ্টা করল।
তার কাছে প্রতিটি সফল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য সম্মান অর্জনের একটি সুযোগ।
দীর্ঘ দায়িত্ব পালন শেষে একসময় আরিফ দেশে ফিরে এল। বিমানবন্দরে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার মুহূর্তে সে গভীরভাবে শ্বাস নিল। পরিচিত বাতাস, মানুষের কণ্ঠ, বাংলায় কথা বলার স্বাভাবিকতা—সবকিছুই তার কাছে অসাধারণ মনে হচ্ছিল।
তারপর সে গ্রামের বাড়িতে গেল।
বয়সের ভারে বাবা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। মায়ের চুলে পেকে গেছে অনেকখানি। কিন্তু ছেলেকে সেনাবাহিনীর পোশাকে দেখে দুজনের মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠল, তার তুলনা কোনো পুরস্কারের সঙ্গে হয় না।
মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বললেন, “তুই ফিরে এসেছিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
আরিফ মায়ের কাঁধে মাথা রাখল। ছোটবেলায় যে মায়ের হাত ধরে সে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই হাতেই সে নিজের সাফল্যের গল্প তুলে দিতে চাইল।
কয়েক দিন পর সে গ্রামের স্কুলে গেল। পুরোনো শ্রেণিকক্ষ, মাঠ আর সেই পথ—সবকিছু যেন অতীতের দরজা খুলে দিল। মজিবর স্যার তখন অবসর নিয়েছেন। আরিফ তাঁর সঙ্গে দেখা করে সালাম জানাল।
স্যার হাসিমুখে বললেন, “দেখলি, স্বপ্নের সঙ্গে পরিশ্রম যোগ হলে মানুষ কত দূর যেতে পারে!”
আরিফ বিনয়ের সঙ্গে বলল, “স্যার, আপনাদের উৎসাহ না পেলে হয়তো এতটা পথ আসতে পারতাম না।”
স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার চারপাশে জড়ো হলো। কেউ জানতে চাইল, সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়া কেমন; কেউ জানতে চাইল, বিদেশে দায়িত্ব পালন করতে কেমন লাগে।
আরিফ তাদের বলল, “তোমাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন আলাদা হতে পারে। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। কিন্তু যে স্বপ্নই দেখো, তার জন্য নিয়মিত পরিশ্রম করতে হবে। দারিদ্র্য বা প্রতিকূলতা তোমাদের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু নিজের যোগ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা বন্ধ কোরো না।”
এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক দরিদ্র ছাত্র নিচু গলায় বলল, “স্যার, আমারও অনেক বড় স্বপ্ন আছে। কিন্তু আমাদের বাড়িতে টাকা নেই।”
আরিফ ছেলেটির কাঁধে হাত রাখল।
“টাকা না থাকলে পথ কঠিন হয়, এটা সত্যি। কিন্তু তোমার স্বপ্নের মূল্য তোমার পরিবারের সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। ভালোভাবে পড়াশোনা করো, শিক্ষকদের সাহায্য নাও, সুযোগগুলো খুঁজে বের করো। আর মনে রেখো, সাহায্য চাইতে লজ্জা নেই, সৎভাবে চেষ্টা করতে লজ্জা নেই।”
ছেলেটির চোখে আশার আলো জ্বলে উঠল।
আরিফ বুঝল, তার জীবনের সংগ্রাম শুধু তাকে একজন সেনা কর্মকর্তা করে তোলেনি; অন্য কারও স্বপ্ন জাগিয়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।
সন্ধ্যায় আরিফ গ্রামের নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, আকাশের পশ্চিম দিগন্ত লাল হয়ে উঠেছিল। নদীর পানিতে সেই লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। দূরে গ্রামের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল।
সে পকেট থেকে ছোট্ট একটি বাংলাদেশের পতাকা বের করল। পতাকাটি তার কাছে শুধু একটি কাপড়ের টুকরো ছিল না। এর প্রতিটি রঙের সঙ্গে মিশে ছিল ইতিহাস, মানুষের আত্মত্যাগ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি জাতির পরিচয়।
তার মনে পড়ল ছোটবেলার সেই দিনটির কথা, যেদিন প্রথম সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে সে স্বপ্ন দেখেছিল। কত পথ পেরিয়ে এসেছে সে! কত অভাব, অপমান, নির্ঘুম রাত, শারীরিক ক্লান্তি আর মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাকে এগোতে হয়েছে!
তবু তার গল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়া নয়। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—প্রতিকূলতার কাছে নিজের স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে অঙ্গীকার করল—
“আমি এই মাটির সন্তান। এই দেশের নদী, মাঠ, মানুষ আর আকাশ আমার পরিচয়। আমার দায়িত্ব যত দিন থাকবে, আমি সততা, শৃঙ্খলা ও সাহসের সঙ্গে তা পালন করার চেষ্টা করব। দেশের মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখব। নিজের পদকে কখনো অহংকারের কারণ হতে দেব না। মনে রাখব, ইউনিফর্ম আমাকে শুধু সম্মান দেয় না, আমাকে দায়িত্বও দেয়।”
নদীর ওপারে সন্ধ্যা আরও গভীর হলো। গ্রামের ঘরগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠল। হয়তো কোনো ঘরে মা সন্তানের জন্য খাবার সাজিয়ে রাখছেন, কোনো বাবা দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন, কোনো শিশু আগামীকালের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তাদের প্রত্যেকের নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন যেন দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আরিফের মনে হলো, একজন সৈনিকের প্রকৃত সাফল্য কেবল পদক, পদবি কিংবা প্রশংসায় মাপা যায় না। তার প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠায়, মানুষের প্রতি সম্মানে এবং দেশের জন্য সৎভাবে কাজ করে যাওয়ার মধ্যে।
রাতের আকাশে তখন অসংখ্য তারা জ্বলছে। আরিফ পতাকাটি যত্ন করে ভাঁজ করে রাখল।
তার শৈশবের স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে। কারণ কিছু স্বপ্ন অর্জনের পর শেষ হয়ে যায় না; বরং নতুন দায়িত্বের মধ্য দিয়ে আরও বড় হয়ে ওঠে।
চরনদীর সেই দরিদ্র ঘরের ছেলেটি একদিন নিজের যোগ্যতায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েছিল। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও সে ভুলে যায়নি নিজের শিকড়, মায়ের ত্যাগ, বাবার আশীর্বাদ কিংবা সেই পুরোনো কেরোসিনের বাতিকে।
সে জানত, তার পরিচয়ের সবচেয়ে গর্বের অংশ কোনো পদবি নয়।
তার পরিচয়—সে বাংলাদেশের সন্তান।
আর যত দিন তার দায়িত্ব থাকবে, তত দিন সে নিজের কর্ম, সততা ও দেশপ্রেমের মধ্য দিয়ে সেই পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা করার চেষ্টা করবে।
কারণ দেশের জন্য ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয়; দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করার মধ্যেই তার সত্যিকারের প্রকাশ।
সমাপ্ত।
সেনাবাহিনী গল্প সাহিত্য লিখা স্বপ্ন প্রতিভা
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!