যুক্তরাষ্ট্র   রবিবার ২৫ অক্টোবর ২০২৬,৯ কার্তিক ১৪৩৩

২৬ কোটি টাকার দুই মিনি হিমাগার প্রকল্পে প্রশ্ন, সামনে ৫০০ কোটির পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৭ PM ৫০
২৬ কোটি টাকার দুই মিনি হিমাগার প্রকল্পে প্রশ্ন, সামনে ৫০০ কোটির পরিকল্পনা

মিনি কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণের পর কৃষিপণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছবি: সংগৃহীত

ফল ও সবজি সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তার উদ্দেশ্যে নেওয়া দুটি মিনি কোল্ডস্টোরেজ প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮০টি ছোট হিমাগার স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে ১৫০টি। এর মধ্যে কয়েকটি চালু না হওয়া, সংরক্ষিত পণ্যের মান নষ্ট হওয়া এবং কৃষকদের প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ার বিষয় উঠে এসেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রভাব মূল্যায়নে।

ডিএইর মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে বর্তমান ব্যবস্থায় মিনি কোল্ডস্টোরেজ আরও সম্প্রসারণের আগে অধিকতর গবেষণার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই দেশে আরও প্রায় দুই হাজার ছোট হিমাগার স্থাপনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ফলে আগের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পের একটিতে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি এবং অন্যটিতে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথম প্রকল্পের কাজ গত জুনে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয়টির মেয়াদ চলতি বছরের অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৫০টি হিমাগারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

প্রথম প্রকল্পটি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’ নামে বাস্তবায়ন করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পে ১০০টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা হলেও ৫০টি এখনো বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে চালু হয়নি।

চালু থাকা কয়েকটি হিমাগারের কার্যকারিতাও সন্তোষজনক নয় বলে উঠে এসেছে ডিএইর মূল্যায়নে। সংস্থাটির কমিটি ২৬টি হিমাগার সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখতে পায়, কিছু ক্ষেত্রে অল্প সময়েই সংরক্ষিত ফল ও সবজি নষ্ট হচ্ছে। পণ্যের গুণগত মানও ঠিক থাকছে না। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় বর্তমান ব্যবহারের মাত্রায় এসব মিনি কোল্ডস্টোরেজ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সীতাকুণ্ডের উদ্যোক্তা কৃষক কামাল পারভেজ জানান, তাঁর হিমাগারে সংরক্ষণের পর সবজি কুঁচকে যাওয়ার পাশাপাশি রং পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে। কুমিল্লার চান্দিনার উদ্যোক্তা কৃষক শরীফ হোসেনও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গাজীপুর সদর উপজেলার উদ্যোক্তা কৃষক শাহিনুর ইসলাম শাহিনের ভাষ্য, কাঁঠাল ও পেঁপে সংরক্ষণের পর গুণগত পরিবর্তন হয়েছে এবং আলুতে অঙ্কুর গজিয়েছে।

এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ডিএইর অনুসন্ধান কমিটি বিদ্যমান মিনি কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থার আরও সম্প্রসারণ না করে আগে গবেষণা ও মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে। কমিটির আহ্বায়ক ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলম বলেন, মাঠপর্যায়ে যা পাওয়া গেছে, তা-ই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এরই মধ্যে প্রথম প্রকল্পের পর ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্প’ নামে দ্বিতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে ৮০টি হিমাগার তৈরির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৪ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ৫০টির নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে হিমাগারের স্থান নির্বাচন ও উদ্যোক্তা কৃষক বাছাইয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুটি প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুরের মতে, মিনি হিমাগারে কোন ফসল কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের যথাযথ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তিনি জানান, লোডশেডিং এবং কিছু স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার কারণে সংরক্ষিত ফসল নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি কারিগরি সমস্যা ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতার ঘাটতিকেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদন হয় এমন এলাকায় হিমাগারের স্থান নির্বাচন করা হলে কার্যকারিতা বাড়তে পারত। কয়েকটি হিমাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, এসব স্থাপনায় দীর্ঘ সময় ফসল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অন্তত তিন মাস সংরক্ষণ করা গেলে ব্যবস্থাটি আরও কার্যকর হতো বলে মত দেন তিনি।

আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে আরও দুই হাজার ছোট হিমাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি হিমাগার পরিচালনায় ২০ জন কৃষককে নিয়ে কমিটি করা হবে এবং স্থাপনাগুলো সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চালানোর কথা রয়েছে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই হাজার হিমাগার হলে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি সুবিধা পেতে পারেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন উদ্যোগটি আগের দুই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু পণ্য সংরক্ষণ নয়, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সোলার এয়ারফ্লো প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, সোলার ফ্রুট ড্রায়ার এবং ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। কৃষকেরা বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন—এমন ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

‘সৌরশক্তিনির্ভর মিনি হিমাগার ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবিত এ উদ্যোগের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। তবে আগের দুই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নতুন প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, বড় পরিসরে নতুন বিনিয়োগের আগে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করা জরুরি। ছোট হিমাগারগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আরও দুই হাজার স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত কি না, সেটি আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।

কৃষিপণ্যে

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!