যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

ভারতের নির্বাচন কমিশন: অভিযোগ গণতন্ত্রের দলীয় পাহারাদার

পপি দেবী থাপা

পপি দেবী থাপা

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৮ PM | সর্বশেষ আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৪ PM ১০৩
ভারতের নির্বাচন কমিশন: অভিযোগ গণতন্ত্রের দলীয় পাহারাদার

ছবি: সংগৃহীত

যার হাতে নিরপেক্ষতার মানদণ্ড তাকে নিয়েই যদি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, এবং সাধারণ বুদ্ধি যদি সেই অভিযোগকে সত্য মনে করে তবে সরিষার ভূত নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। সেই ভূতেরা যতই ভগবান আর আইনের দোহাই দিন— মানুষ জটিল কেতাবি প্যাঁচ ছুড়ে ফেলে তারস্বরে চিৎকার করে- ঢের হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে সম্প্রতি পরিস্থিতি অনেকটাই এমন। গণতন্ত্রে ভোট হলো নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের প্রধান মাধ্যম। সেই কথোপকথনের মাঝখানে থাকা পাহারাদার প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে ‍যদি প্রশ্ন ওঠে তখন সেটি কোনো একটি দল বা নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আঙুল ওঠে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর।

ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার নির্বাচন ব্যবস্থা। সরকার বদলেছে, দল বদলেছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছে কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে একটি মৌলিক বিশ্বাস দীর্ঘদিন টিকে ছিল—ক্ষমতায় যেই থাকুক, ভোটের মাঠের শেষ পাহারাদার প্রতিষ্ঠানটি অন্তত দলীয় পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করবে। আজ সেই বিশ্বাসই প্রশ্নের মুখে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ঠিক সেই জায়গাতেই পৌঁছেছে। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়ে ভারতের এতদিনের সুনামে কি তবে ভাটা পড়েছে? গত কয়েক বছর ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা, ভোটাধিকার ও কমিশনে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে যে সব কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল তা যেন সরব করে দিয়েছে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। উক্ত প্রতিবেদনে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নজিরবিহীন ফাটল এবং ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি মানুষের নাম কীভাবে বাদ পড়েছে, সেটি উঠে এসেছে। যা এখন ভারতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ, কমিশনারদের মধ্যে লিখিত আপত্তির খবর এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক প্রশ্ন—সব কিছুই  এখন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বিরোধী দলগুলো পক্ষপাতের অভিযোগ করেছে। নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এস আই আর আইনসম্মত প্রক্রিয়া। ফলে এখন পর্যন্ত বিতর্কের একটি অংশ রাজনৈতিক বক্তব্য, অন্য অংশ নথি, পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আদালতের বিচারাধীন প্রশ্ন। এই পার্থক্যটিই গণতান্ত্রিক আলোচনায় বজায় রাখা জরুরি।

সেপ্টেম্বরে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি-গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন। তাদের আপত্তির সঙ্গে ভোটার-তথ্য ব্যবস্থাপনা ও এসআইআর-সংক্রান্ত বিষয়ও যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। কমিশন অবশ্য বলেছে, মতামত, পর্যবেক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার স্বাভাবিক অংশ এবং কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে।

একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। মতপার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্য কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিভুক্ত হয় এবং জনগণের কাছে তার ব্যাখ্যা কতটা স্বচ্ছভাবে পৌঁছায়- গণতন্ত্রে সেটিই দেখবার বিষয় ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বলা হয়েছে, প্রাথমিক খসড়া তালিকায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম নিয়ে বাদ পড়া বা পুনরায় যাচাইয়ের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় তথ্য ও রাজনৈতিক বিতর্কে উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা হলো, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার তালিকাভুক্ত বা খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ভোটারদের শনাক্ত করার আইনসম্মত প্রক্রিয়াই চলছে। কমিশন পরে বাড়ি বাড়ি যাচাই এবং সফটওয়্যার পর্যালোচনার মতো কিছু পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছে।

বিরোধীদের প্রশ্ন-একজন বৈধ ভোটারকে নিজের নাগরিকত্ব বা ভোটার-যোগ্যতা প্রমাণের ভার কতটা সহজে দেওয়া যায়? আর সেই প্রক্রিয়ায় যদি প্রকৃত ভোটার বাদ পড়ে যান, তাহলে তাঁর ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা দ্রুত ও কার্যকর?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, এসআইআর-এর মাধ্যমে বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং উত্তর প্রদেশের আগের নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনেছেন। তেজস্বী যাদবও বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছেন।

বিজেপি নেতৃত্ব অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও বিজেপির কয়েকজন শরিকও প্রথমে কমিশনের কাছে প্রকাশ্য ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। চিরাগ পাসোয়ান, উপেন্দ্র কুশওয়াহা ও চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বাধীন জোটসঙ্গীরা বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনকে মানুষের সন্দেহ দূর করতে হবে। পরে কমিশনের ব্যাখ্যার পর অন্ধপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু বলেন, কমিশনের সর্বসম্মত ব্যাখ্যা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্নিশ্চিত করেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন শুধু নির্বাচন পরিচালনাকারী একটি দপ্তর নয়; এটি সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের অধীন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৩ সাল থেকে এটি তিন সদস্যের কমিশন হিসেবে কাজ করছে। ইতিহাসে কমিশনের ভেতরে মতপার্থক্যের নজিরও রয়েছে-টি. এন. শেষন, এন. গোপালস্বামী ও অশোক লাভাসার সময়েও কমিশনের সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ্য মতভেদ দেখা গেছে। মতপার্থক্য নতুন নয়। নতুন হলো আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে সেই মতপার্থক্য অনেক দ্রুত জনআস্থার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে।

শেষনের সময়ে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ ধারণা—নির্বাচনের মাঠে কমিশন হবে ক্ষমতাসীন দলেরও ওপরে, বিরোধী দলেরও ওপরে। নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আজ সেই পুরোনো প্রত্যাশার সঙ্গেই বর্তমান কমিশনের কার্যক্রমকে মাপা হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগব্যবস্থা।

২০২৩ সালের আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতাকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের অনুপ বারনোয়াল অহড়ড়ঢ় ইধৎধহধিষ মামলায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কমিটির কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের আইন সেই কাঠামো পরিবর্তন করে প্রধান বিচারপতির জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত মন্ত্রীকে বসিয়েছে। এই আইন নিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জও চলছে। সেপ্টেম্বরে দুই বিচারপতির বেঞ্চে এ বিষয়ে বিভক্ত মত দেখা যাওয়ায়,  বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান ‘স্বাধীন’ এটা কাগুজে হওয়া যাবে না তাকে ‘স্বাধীন’ বলে দৃশ্যমান হতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও এই ‘পারফেকসন অফ ইনডিপেন্ড’-এর গুরুত্ব উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে নিরপেক্ষ কি না, জনগণের চোখে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বাধীন-সেটিও গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস। একটি নির্বাচন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিতর্কিত হতে পারে, আদালত তার প্রতিকারও দিতে পারে। কিন্তু কোটি কোটি ভোটারের মনে যদি  প্রশ্ন জন্ম নেয়—‘আমার ভোটের আগে আমার নামটিই কি নিরাপদ?’ ভোট কেন্দ্র, ভোট ব্যবস্থাপনায় কারসাজির কারণে কাঙ্খিত ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ। তাহলে সমস্যাটি আরও গভীর।

ভারতের গণতন্ত্র বহু ঝড় পেরিয়েছে। সরকার এসেছে, সরকার গেছে; দল জিতেছে, দল হেরেছে। গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন বিজয়ী জানে সে জিতেছে, পরাজিতও বিশ্বাস করে সে হেরেছে—কিন্তু খেলাটির নিয়ম অন্তত তার বিরুদ্ধে গোপনে বদলে দেওয়া হয়নি। সেই বিশ্বাস রক্ষা করাই এখন ভারতের নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ ব্যালট বাক্সের পাহারাদারকে নিয়ে যদি পাহারাই প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে শুধু একটি নির্বাচন নয়-গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থাই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। লক্ষণ কিন্তু সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 লেখক: গবেষক, কলামিস্ট।

ভারত নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী জনআস্থা হস্তক্ষেপ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!