ছবি:সংগৃহীত
দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পথে বড় বাধা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, সাংবাদিকতাও এই রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে নেই।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
মাহফুজ আনাম বলেন, দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসকদের মধ্যেও এমন বিভাজন দেখা যায়। সাংবাদিকদের মধ্যেও বিএনপিপন্থী, আওয়ামী লীগপন্থী বা জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিতির প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন সাংবাদিক একই সঙ্গে কীভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষের মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত থাকতেই পারে এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীন। তবে সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ যেহেতু বিশ্বাসযোগ্যতা, তাই প্রকাশ্যে কোনো দলের পক্ষ নেওয়া সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
আলোচনায় আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করলেও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে দুর্নীতি, দলীয় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুকূল্য বাড়ে এবং ধীরে ধীরে শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হলেও স্বৈরশাসনের পতনের পর সেই ঐক্য অনেক সময় ধরে রাখা যায়নি।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা হলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
দেশ পরিচালনায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষ আমলাতন্ত্র ও কার্যকর পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা, সীমিত ভূখণ্ড এবং প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মানবসম্পদকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করতে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনের সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।
বক্তব্যের শুরুতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন সংকটের কথাও তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত বাড়ছে এবং সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বেশি সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, সামরিক শক্তি ও অস্ত্রের সক্ষমতাকে সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিকতা ও রাজনীতি মাহফুজ আনাম
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!