যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২৬,৭ কার্তিক ১৪৩৩

ভূমধ্যসাগরে নৌকা ফুটো, মিশরে আটক ৬ বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৭ PM ৮৫
ভূমধ্যসাগরে নৌকা ফুটো, মিশরে আটক ৬ বাংলাদেশি

ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় লিবিয়ার তোব্রুক থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বিপদে পড়া ছয় বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে মিশরে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা দামিয়েত্তা জেলার একটি অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং জানিয়েছে।

উৎসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট ৩৮ জনকে নিয়ে লিবিয়ার তোব্রুক থেকে একটি রাবারের নৌকা ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাত্রীদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি ছাড়াও ১৭ জন মিশরের, ৬ জন সুদানের, ৬ জন ইথিওপিয়ার এবং ৩ জন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক ছিলেন।

যাত্রার প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর নৌকার নিচের অংশে ফুটো ধরা পড়ে। দ্রুত নৌকার ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাদের কাছে কার্যকর কোনো আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। বিপদের সময় দালালদের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি তারা।

পরে ভূমধ্যসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন যাত্রীরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফ্রান্সের ‘থেমিস’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। সেখান থেকে মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে পৌঁছাতে আরও প্রায় দেড় দিন সময় লাগে। ফলে রাবারের নৌকায় যাত্রা ও উদ্ধারের পর জাহাজে থাকা মিলিয়ে প্রায় তিন দিন সমুদ্রে কাটাতে হয় তাদের।

উদ্ধার হওয়া ছয় বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে বাংলাদেশ ও লিবিয়ার দালালদের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান। ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ জোগাড় করতে কেউ জমি বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ঋণ বা ধার করেছেন। তবে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের ইউরোপে পাঠানোর বদলে প্রায় ছয় মাস একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সমুদ্রযাত্রার প্রায় তিন দিন আগে তাদের একটি নির্দিষ্ট ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। দালালদের কাছে জায়গাটি ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সেখান থেকে তাদের রাবারের নৌকায় তুলে সমুদ্রযাত্রায় পাঠানো হয়।

উদ্ধার হওয়া ছয় বাংলাদেশির সবাই নরসিংদীর বাসিন্দা। তাদের মধ্যে পাঁচজন বেলাব উপজেলার এবং একজন রায়পুরা উপজেলার। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় মূল দালাল হিসেবে আব্দুর রহমান এবং বাংলাদেশি দালাল হিসেবে শাহিদা আক্তারের নাম এসেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা ও ভূমিকা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা দামিয়েত্তায় গিয়ে আটক ছয় বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা করেন। দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগরে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর তারা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। পুলিশের অনুমতি নিয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ছয়জনকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন।

মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে তাদের বাংলাদেশে ফেরানোর উদ্যোগ চলছে।

ছয় বাংলাদেশি প্রাণে বেঁচে গেলেও ঘটনাটি ইউরোপমুখী অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি আবারও সামনে এনেছে। বিশেষ করে নেভিগেশন ব্যবস্থা ছাড়া রাবারের নৌকায় যাত্রী পাঠানো এবং লিবিয়ায় দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!