আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে বাড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয়। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি আমদানি নিয়ে আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির ব্যয় পুরো বছরের বরাদ্দকে ছাড়িয়ে আড়াই গুণেরও বেশি হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।
বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কাতার থেকে নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি না আসায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কাতারের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে পেট্রোবাংলাকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনার উদ্যোগ নিতে হয়েছে। এতে আমদানির খরচ বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির তুলনায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ে। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ২০ ডলারের বেশি দামে কিনতে হয়েছে। কিছু জরুরি ক্রয়ে দাম ২৬ থেকে ৩০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছেছে। সংঘাতের আগে তুলনামূলক কম দামে কেনা কার্গোর সঙ্গে এই দামের পার্থক্য আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি টাকার বিনিময়মূল্যের ওঠানামাও ডলারে জ্বালানি কেনার মোট খরচে প্রভাব ফেলছে।
দেশীয় বাজারে গ্যাস বিক্রির মূল্য আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম থাকায় দুইয়ের মধ্যকার ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে শুধু আমদানি ব্যয়ই বৃদ্ধি পায় না, সরকারের বাজেটের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেশি দামে কার্গো কেনার প্রয়োজন হলে এই আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
পেট্রোবাংলার কার্গো সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত হিসাবের ভিত্তিতে কয়েকটি প্রতিবেদনে এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য বাড়তি ব্যয়ের হিসাব; সরকারের চূড়ান্ত ভর্তুকি ব্যয় নয়। প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে কতটি কার্গো কেনা হচ্ছে, সেগুলোর মূল্য কত, সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন থাকছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য খাতে সরবরাহ বজায় রাখতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এলএনজি কেনার জন্য অতিরিক্ত ডলার ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, জ্বালানির অপচয় কমানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কার্যকর রাখা, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং আগাম ক্রয় পরিকল্পনা জোরদার করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব। এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয় তাই শুধু জ্বালানি খাতের বিষয় নয়; সরকারি বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এলএনজি আমদানি জ্বালানি খাত
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!