যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬,৮ কার্তিক ১৪৩৩

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ১,৭৪৭, ক্ষতিগ্রস্ত ৭৩৫ স্কুল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৪ PM ৩৬
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ১,৭৪৭, ক্ষতিগ্রস্ত ৭৩৫ স্কুল

শিক্ষার মান ও বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। সংগৃহীত ছবি

ফ্রান্সে শিক্ষার মান ও শিক্ষা খাতে পরিকল্পিত বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে দেশটির ৩ হাজার ৭০০ স্কুলের মধ্যে ৭৩৫টি কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।

গত সপ্তাহে প্যারিসে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন, দীর্ঘ সময় স্কুলে অবস্থান এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছিল। পরে সেই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

শুক্রবার রাতে ফ্রান্সের টিএফ ১ টেলিভিশনকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, ‘দাঙ্গা ও সহিংসতা বাড়ছে। পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে আমরা সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ একই দিনে বিচারমন্ত্রী জেরাল দারমানিন বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এখন জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রের দাবি, আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের হাত থেকে অ-শিক্ষার্থীদের কাছে চলে গেছে। বিএফএমটিভিকে তিনি বলেন, শিক্ষকেরা তাঁকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভে তাঁদের সামনে থাকা অনেকেই তাঁদের শিক্ষার্থী ছিলেন না।

শুক্রবার উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের বেলফোরে বিক্ষোভ চলাকালে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক তরুণকে হত্যাচেষ্টার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিবিসি দুটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেছে, যেখানে ওই তরুণকে পুলিশ কর্মকর্তাকে আক্রমণ করতে দেখা যায়।

ভিডিওতে একদল তরুণকে ওই কর্মকর্তাকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাঁকে মাথায় ঘুষি ও লাথি মারা হয়। পরে একজন মন্ত্রী নিশ্চিত করেন, হামলার শিকার ব্যক্তি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৬৫ জন কর্মী আহত হয়েছেন। প্যারিসের উপশহর প্যাঁতাঁতে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় এবং কয়েকজনকে আটক করে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় স্ত্রাসবুর্গে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। রেন ও প্যারিসেও আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে পেট্রলবোমা, একটি কুঠার এবং তথাকথিত মর্টার আতশবাজি জব্দ করার কথা জানিয়েছে। নঁতের নেলসন ম্যান্ডেলা উচ্চবিদ্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডে দুই মিলিয়ন ইউরোর বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক সরকার। আগুনে স্কুলটির কাচের প্রবেশপথসহ ভেতরের কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্দোলনকারীদের একজন ১৬ বছর বয়সী লোলা শুক্রবার এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে বলতে গেলে, আমরা জিতে গেছি। আজ সকালে আমাদের স্কুল বন্ধ।’ পুলিশের আচরণ নিয়েও অভিযোগ করে সে বলে, পুলিশি মারধর ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্কুলে দীর্ঘ সময় অবস্থান, অতিরিক্ত গরম শ্রেণিকক্ষ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কর্মীর অনুপস্থিতি। এর পাশাপাশি শিক্ষা খাতে অর্থায়ন কমাতে পারে—এমন পরিকল্পিত বাজেট কাটছাঁটও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে।

আন্দোলনের কারণে অনেক স্কুলে পাঠদান বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ প্যারিসের ক্লদ মনে স্কুলে সন্তানকে খুঁজতে আসা ৫৩ বছর বয়সী আনিয়া এএফপিকে জানান, তিনি ছেলেকে সেখানে যেতে নিষেধ করেছিলেন এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

বিচারমন্ত্রী জেরাল দারমানিন জানিয়েছেন, সন্তানদের কর্মকাণ্ডে যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেসবের দায় অভিভাবকদের ওপর দেওয়ার এবং মেরামতের ব্যয় আদায়ের বিষয়ে প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কয়েকটি শ্রমিক ইউনিয়ন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। শিক্ষা ইউনিয়ন এসএনইপি-এফএসইউ, সরকারি পরিষেবা ইউনিয়ন এসএনইউইপি-এফএসইউ এবং সলিডেয়ারস তাদের সদস্যদের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

সলিডেয়ারস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘তাদের যেন আমাদের সন্তানদের ওপর গুলি চালাতে না দেওয়া হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সমাবেশ, সংগঠন ও বিক্ষোভ করার স্বাধীনতা রয়েছে।’

এদিকে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে ফ্রান্সে এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, সরকারি ব্যয় এবং তরুণদের অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!