যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬,৮ কার্তিক ১৪৩৩

সাদা লবণ নাকি খনিজ লবণ, হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি ভালো?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ PM ৯২
সাদা লবণ নাকি খনিজ লবণ, হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি ভালো?

ছবি: সংগৃহীত

সাদা লবণের পরিবর্তে খনিজ লবণ ব্যবহার করলেই হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়—এমন প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদা লবণ ও খনিজ লবণ দুটির প্রধান উপাদানই সোডিয়াম ক্লোরাইড। তাই একই পরিমাণ সোডিয়াম গ্রহণ করলে শুধু লবণের ধরন পরিবর্তনের কারণে হৃদ্‌স্পন্দন বা হৃদ্‌স্বাস্থ্যে বড় ধরনের পার্থক্য হওয়ার কথা নয়।

সাধারণ খাবার লবণ পরিশোধনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং এতে মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে। অনেক দেশে আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধে এতে আয়োডিন যোগ করা হয়। অন্যদিকে, খনিজ বা রক সল্ট তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত এবং এতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো কিছু খনিজ অল্প পরিমাণে থাকতে পারে। তবে এসব খনিজের পরিমাণ এত বেশি নয় যে এটিকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের বিশেষ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডা. অংশুমান কৌশলের মতে, রক সল্ট, পিংক সল্ট বা অন্যান্য খনিজ লবণকে সাধারণ লবণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মনে করা ঠিক নয়। শরীর এগুলোর সোডিয়াম মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড হিসেবেই গ্রহণ করে। ফলে দামি খনিজ লবণ ব্যবহার করলেই হৃদ্‌যন্ত্র বেশি সুরক্ষিত থাকবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো মোট সোডিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম গেলে পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে রক্তের পরিমাণ এবং রক্তনালিতে চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ করলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যা হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে হৃদ্‌স্পন্দনের হার শুধু লবণ খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, পানিশূন্যতা, কিছু ওষুধ এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও হৃদ্‌স্পন্দনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খনিজ লবণ খেলে বিশ্রাম অবস্থায় হৃদ্‌স্পন্দন কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

খনিজ লবণে সামান্য পটাশিয়াম থাকতে পারে। কিন্তু সেই পরিমাণকে উচ্চ রক্তচাপ বা দ্রুত হৃদ্‌স্পন্দনের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং খনিজ লবণ বেশি ব্যবহার করলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে।

প্রাকৃতিক বা কম প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় খনিজ লবণ ইচ্ছেমতো খাওয়া যায়—এমন ধারণাও ঠিক নয়। রান্নার পাশাপাশি সালাদ বা অন্যান্য খাবারের ওপর অতিরিক্ত লবণ যোগ করলে দৈনিক মোট সোডিয়াম গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। ফোর্টিস হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের পরিচালক ডা. যোগেশ কে. ছাবরার মতে, খনিজ লবণকে নিরাপদ মনে করে বেশি ব্যবহার করলে শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ঢোকার ঝুঁকি থাকে। এতে রক্তচাপ বাড়ার পাশাপাশি কিডনির ওপরও চাপ পড়তে পারে।

ম্যাক্স হেলথকেয়ারের সিটিভিএস বিভাগের প্রিন্সিপাল কনসালট্যান্ট ডা. ঋত্বিক রাজ ভূঁইয়া বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ ও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিনের মোট লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

লবণ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আয়োডিনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার। সাধারণত আয়োডিনযুক্ত লবণে এই প্রয়োজনীয় উপাদান যোগ করা হয়, কিন্তু অপরিশোধিত খনিজ লবণে বাড়তি আয়োডিন নাও থাকতে পারে। থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন প্রয়োজনীয় এবং এই হরমোন হৃদ্‌স্পন্দনের স্বাভাবিক হার বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে। তাই আয়োডিনযুক্ত লবণ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আগে খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত আয়োডিন পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন মোট লবণ গ্রহণ ৫ গ্রামের কম রাখা উচিত। শুধু রান্নার লবণ নয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, রেডিমেড সস ও বেকারি পণ্যের মাধ্যমেও অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই এসব খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

খাবারে থাকা পটাশিয়ামের জন্য শুধু খনিজ লবণের ওপর নির্ভর না করে কলা, ডাল, পালংশাক ও মিষ্টি আলুর মতো খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে খাবারে পটাশিয়ামের পরিমাণ বাড়ানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, সাঁতার বা সাইক্লিংয়ের মতো নিয়মিত ব্যায়াম সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্যে উপকারী হতে পারে।

বিশ্রাম অবস্থায় হৃদ্‌স্পন্দন নিয়মিতভাবে প্রতি মিনিটে ১০০ বারের বেশি হলে তা ট্যাকিকার্ডিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হৃদ্‌স্পন্দন বারবার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বা ধড়ফড়, মাথা ঘোরা, বুকে অস্বস্তি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তাই হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সাদা লবণ থেকে খনিজ লবণে পরিবর্তন করাই মূল বিষয় নয়। প্রতিদিন মোট কতটা লবণ ও সোডিয়াম গ্রহণ করা হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাস কেমন এবং উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে কি না—এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগ থাকলে শুধু লবণের ধরন পরিবর্তন করে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!