ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে গতি ফিরছে না। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে কিছুটা উন্নতি থাকলেও বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুলাইয়ে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হলেও আগস্টে আবার কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। অথচ একই মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি আরও বেশি, ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ফলে ব্যাংকে অর্থ জমার প্রবণতা বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
গত বছরের আগস্টের সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। ওই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা চলতি বছরের আগস্টে কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি গত বছরের ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধিও গত বছরের ১০ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে। এর আগে জুনের হিসাবেও বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি কমার চিত্র দেখা গিয়েছিল। মে মাসের তুলনায় জুনে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশে এলেও সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপ কাটেনি। জিইডির তথ্য অনুযায়ী, জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়। ওই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছিল। প্রতিবেদনে এর পেছনে চালের দাম কমার প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়ালেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জুলাইয়ের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে আগস্টে এ হার হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপের তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাবে, শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার জুলাইয়ে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থাকলেও আগস্টে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে বেশি থাকায় আয় বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না সরকার। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছিল। আগস্টে ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ফলে ওই মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে আগের বছরের আগস্টের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় আগের বছরের তুলনায় বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
জিইডির প্রতিবেদনগুলোর সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আহরণ এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফেরাতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তির বাধা কমানো, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাংক মূল্যস্ফীতি রাজস্ব জিইডি
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!