ছবি:সংগৃহীত
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বড় কোনো পরিবর্তন না এনেও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া সম্ভব। গবেষণার বিভিন্ন ফলাফল বলছে, নিয়মিত একা খাওয়ার পরিবর্তে পরিবার, বন্ধু কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস মানসিক সুস্থতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। এমনকি এ ধরনের সামাজিকভাবে একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস বিষণ্নতার ঝুঁকি কমার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সামাজিক অভ্যাসকে গবেষণায় ‘কমেনসালিটি’ বলা হয়। খাবারের টেবিল শুধু খাবার গ্রহণের জায়গা নয়; এটি মানুষের মধ্যে কথা বলা, মতবিনিময় এবং পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগও তৈরি করে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রভিন্সিয়াল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একটি গবেষণায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৯ হাজার ৩৬১ জন নারীকে নিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অন্যদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার পরিমাণের সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকির একটি সম্পর্ক রয়েছে। বয়স, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিস্থিতিসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়।
জাপানে পরিচালিত আরেক গবেষণাতেও কাছাকাছি ফল পাওয়া গেছে। ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী এমন ব্যক্তিদের মধ্যে, যারা পরিবারের সঙ্গে বসবাস করলেও নিয়মিত একা খাবার খেতেন, তাদের বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকে, যা একাকিত্বের অনুভূতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
২০২৪ সালের ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-এর তথ্য বিশ্লেষণেও সামাজিকভাবে খাবার খাওয়ার সঙ্গে ভালো থাকার একটি সম্পর্ক উঠে এসেছে। প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, যারা অন্যদের সঙ্গে বেশি দিন দুপুর বা রাতের খাবার খেয়েছেন, তাদের মানসিক সুস্থতার মাত্রাও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস মানুষের সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে পারে। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে খাবারের সময় কাটানো জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবিক নৃবিজ্ঞানী রবিন ডানবারের মতে, একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় শরীরে এন্ডোরফিনের কার্যক্রম বাড়তে পারে। এন্ডোরফিন শরীরের স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া এমন রাসায়নিক, যা আনন্দ ও ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে শুধু একসঙ্গে খাবার খেলেই বিষণ্নতা প্রতিরোধ করা যায়—এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাগুলো থেকে দেওয়া যায় না। বরং সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই অভ্যাসকে একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখা যায়।
ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সুযোগ অনেক সময় কমে যায়। তবে প্রতিদিন অন্তত একটি খাবারের সময় পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা কাছের মানুষের সঙ্গে বসার চেষ্টা করা সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।
খাবারের মেনুতে বড় পরিবর্তন না এনেও তাই খাবার খাওয়ার পরিবেশে পরিবর্তন আনা সম্ভব। নিয়মিত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং খাবার ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস মানসিক ভালো থাকার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!