যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬,১৮ কার্তিক ১৪৩৩

বাংলা QR: অভিন্ন নাকি ন্যায্য চার্জ

মোহাম্মদ ফারুক হোসেন

মোহাম্মদ ফারুক হোসেন

প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৬ PM | সর্বশেষ আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৭ PM ১৯১
বাংলা QR: অভিন্ন নাকি ন্যায্য চার্জ

বাংলা QR পেমেন্ট সহজীকরণ বা QR-এর চার্জ, এই সামগ্রিক বিষয়ে ভূমিকার খুব একটা দরকার নেই, বরং সরাসরি দেখে নিতে পারি আমরা কী করতে পারি। বাংলা QR এর চার্জ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে এর চার্জিং স্ট্রাকচারের দিকে, এবং এখানে সর্বনিম্ন শব্দটা অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সর্বোচ্চ হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যার প্রভাব বোঝা যাবে আরেকটু পর।

সবার বোঝার স্বার্থে বলে রাখা ভালো যে, QR চার্জের বড়ো ২টি ভাগ হচ্ছে প্রোভাইডার বা ইস্যুয়ার ফি (IRF) ও একুয়ারিং ফি। অর্থাৎ একটি ট্রানজেকশন হতে গেলে যার ওয়ালেট থেকে পেমেন্ট সংগঠিত হয় তাকে বলা হয় প্রোভাইডার বা ইস্যুয়ার ও যার QR-এর মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করা হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান থাকছে একুয়ারার-এর ভূমিকায়। উদাহরণস্বরূপ, পেস্টেশন, এমটিবি, পূবালী বা নগদ যদি কোনো দোকানে বা প্রতিষ্ঠানে QR কোড স্থাপন করে তবে সেক্ষেত্রে তারা একুয়ারার এর ভূমিকায় থাকবে এবং সেই QR কোড স্ক্যান করে যদি বিকাশ বা ইবিএল ব্যাংকের গ্রাহক পেমেন্ট সম্পন্ন করেন তবে সেক্ষেত্রে ওই ব্যাংক বা এমএফএসকে বলা হয় প্রোভাইডার বা ইস্যুয়ার।

উল্লিখিত পন্থায় ট্রানজেকশন সম্পন্ন হলে যে ব্যাংক বা এমএফএস ওয়ালেট থেকে পেমেন্টটি সংগঠিত হয় তারা ইস্যুয়ার ফি হিসেবে 'সর্বোচ্চ' ৭ টাকা (হাজারে) কেটে একুয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে সেটেলমেন্ট করে থাকেন এবং একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট-এর সাথে তার নির্ধারিত ফির অংশটুকু কেটে বাকি অর্থ পরিশোধ করে থাকেন, ধরে নেয়া যাক বাকি ৩ টাকা ফি চার্জ এরপর মার্চেন্টের হাতে যায় ৯৯০ টাকা। উদাহরণস্বরূপ, এখানে ১০০০ টাকা পেমেন্ট এর ক্ষেত্রে ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৭ টাকা কেটে রাখেন। তাহলে এই সর্বোচ্চ ফি কোন ধরনের ইস্যুয়ার কেটে রাখেন এবং কেন? বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের আর্থিক ব্যবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস-এর অবদান অনস্বীকার্য এবং ক্যাশ ইন খরচের মডেলের কারণে তাদের কস্ট ও একটু বেশী, যার কারণে যেকোনো পেমেন্টের বেলায় ঐ সর্বোচ্চ চার্জ বা IRF তারাই চার্জ করে থাকেন। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্টের বেলায়ও সেটা প্রযোজ্য। মোবাইল ব্যাংকিং-এর কাস্টমার মার্কেট শেয়ার বেশি বলে স্বাভাবিকভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার্জ এর ট্রানজেকশনই এখানে হয়।

এইবার আসি সর্বনিম্ন চার্জের বিষয়ে। এখানে যদি কোনো ব্যাংকের গ্রাহক পেমেন্ট করে থাকেন তবে সেই সকল ট্রানজেকশন-এর বিপরীতে ইস্যুয়ার ফি ০.৩৫% বা ৩.৫টাকা (হাজারে) কেটে বাকি টাকা একুয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে সেটেলমেন্ট করে থাকে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ টাকার পরিবর্তে ৩.৫ টাকা চার্জ হলেও একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান ঐ মার্চেন্টকে সর্বনিম্ন ১০ টাকাই চার্জ করে থাকে। মার্চেন্ট পর্যায়ে ব্যাংকের গ্রাহক (ক্রেডিট কার্ড ব্যতিত) পেমেন্ট করার যে বেনিফিট বা সর্বনিম্ন IRF, সেটার সুবিধা থেকে মার্চেন্ট বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানে ইস্যুয়ার ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় চার্জের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক ভিন্নতা রয়েছে এবং সেটা একুয়ারার ও ইস্যুয়ারার পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু মুশকিলটা হলো মার্চেন্ট পর্যায়ে চার্জের সরলতায় অর্থাৎ একটা অভিন্ন চার্জ নির্ধারণের বেলায়। এই পর্যায়ে সরাসরি সর্বনিম্ন ১% নির্ধারণ করতে গিয়ে IRF-এর অ্যাডভান্টেজটা মার্চেন্ট পর্যায়ে যাচ্ছে না। চার্জের সরলতার দিকে তাকাতে গিয়ে IRF-এর সর্বোচ্চ চার্জটাই নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে করে ইস্যুয়ার সাইডে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় যদিও এর বার্ডেনের কারণে মার্চেন্ট খরচ কিছুটা বেড়ে গেছে। উল্লেখ্য, ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকেরা নিজেদের সুবিধার জন্য ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করেন কিন্তু এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মার্চেন্ট এর গায়ে। সেক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুয়ার IRF চার্জ সর্বনিম্ন রাখাটাই যুক্তিযুক্ত।

এই বাস্তবতায়, করণীয় হিসেবে আমরা যদি চার্জের মডেলের দিকে ফিরে যাই, তাহলে প্রাথমিকভাবে আমরা দুইটি ভিন্ন চার্জিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি যথা ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে পেমেন্ট। যেমন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে QR পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং থেকে QR পেমেন্ট, এই দুই ভাগে চার্জিং প্রয়োগ করলে কিছুটা সহনশীল হতে পারে। অতিমাত্রায় সরলিকরণের দিকে না গিয়ে ডুয়াল চার্জিং মডেল অনুসরণ করলে মার্চেন্ট পর্যায়ে এর সুবিধা প্রবাহিত হতে পারে যার সুবিধাভোগী হবে গ্রাহক-মার্চেন্ট উভয়ই। এরপর এই ব্যাপারটা মার্কেটের উপর ছেড়ে দিলে তখন মার্চেন্ট-মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক সবাই মিলেই ঠিক করবে কে কার মার্চেন্ট হবে বা কীভাবে পেমেন্ট নিবে। ব্যাংক ও তাদের মোবাইল এপ্স এর গ্রাহক পছন্দের বিষয়টা নিয়ে কাজ করবে যাতে তাদের গ্রাহক সহজেই পেমেন্ট করতে পারেন, ঠিক একইভাবে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানসমূহ সঠিক প্রাইস পয়েন্ট ম্যাচ করার ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতায় নিজেদের ব্যস্ত রাখবেন।

IRF-এর দিকে তাকালে দেখা যায় শুধু মোবাইল ব্যাংকিং-এর দিকে তাকিয়ে চার্জ সেট করলে সেটা সামগ্রিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ হয় না। সরকারি পর্যায়ে ইনসেনটিভ দেয়াটা খুবই সহজ একটা কাজ কিন্তু অর্থনীতির এই সময়ে অন্যান্য অনেক প্রায়োরিটির মধ্যে সেটা সরকারের জন্য কতটুকু বাস্তবসম্মত তা ভাবতে হবে আগে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি ইনসেনটিভের পরিবর্তে বিকল্প অনেক কিছুই পেমেন্ট ডিজিটাইজেশন বা ক্যাশলেস অগ্রযাত্রায় ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন বাংলা QR পেমেন্টে VAT অব্যাহতি, পেমেন্টের অনুপাতে মার্চেন্টদের কর ছাড়, ব্যবসা সহজীকরণ, লোন প্রাপ্তি সহ অন্যান্য অনেক কিছুই যোগ হতে পারে এই ভাবনায়।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পেস্টেশন।

 

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!