ছবি: সংগৃহীত
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার দেশের সামগ্রিক পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ছয় লাখ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। তবে ফলাফলের এই অবনতির মধ্যেও পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯৭৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯৩ জন।
গত বছর ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। তখন পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৫ হাজার ৫৯২ জন। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সে হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট।
সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন, ২০২৫ সালে ৬৯ হাজার ৯৭ জন এবং এবার ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার এই সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এ বোর্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল বোর্ডে—৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গত বছর এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এক বছরে বরিশালে পাসের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ পয়েন্ট।
অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীতে পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিটিতেই গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে।
সাধারণ বোর্ডগুলোতে এবার ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। এসব বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন; গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার ২১৯।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ; গত বছর তা ছিল ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৮৬ জন। দুই বোর্ডেই পাসের হার ও সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।
লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলে ছাত্রীদের অগ্রগতি স্পষ্ট। এবার ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আর ছাত্রীদের ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। সব বোর্ড মিলিয়ে ছাত্রদের তুলনায় ৬৬ হাজার ৩৭১ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৮১টি, মাদ্রাসা বোর্ডের ৫৫টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে, শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫।
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শিক্ষার মান বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাছাকাছি ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পাসের হার কমার পেছনে থাকা কারণগুলো শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে খুঁজে বের করতে হবে।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, কৃত্রিমভাবে পাসের হার বা জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর পরিবর্তে এবার শিক্ষার্থীদের মেধার প্রকৃত ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, উত্তরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা এবং প্রশ্নপত্রের মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত না হয়, সে জন্য দ্রুত পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা ও শিক্ষামন্ত্রী। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করছে সরকার। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষায় অংশ না নেওয়া কিংবা তাতেও উত্তীর্ণ হতে না পারা শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানুর স্বাক্ষরিত কর্মপরিকল্পনায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের সম্পূরক পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচিও দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩ নভেম্বর থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে। প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ শুরু হবে ১ নভেম্বর এবং শেষ হওয়ার কথা ২০ নভেম্বর। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন সাপেক্ষে ২ ডিসেম্বর পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফল প্রকাশের সম্ভাব্য দিন ৩১ ডিসেম্বর।
এবারের ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী মূল্যায়নজনিত কারণে বঞ্চিত হয়েছেন কি না, তা যাচাইয়ের জন্য উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগও থাকবে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, গত এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণে নতুন করে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। এবারও উত্তরপত্রে ভুল বা অসংগতি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে। পরীক্ষকদের তুলনামূলক কমসংখ্যক খাতা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ফলাফলের অবনতির কারণ হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী সামগ্রিক পাঠদান পদ্ধতি, পাঠ্যবই এবং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক দুর্বল ফলের কথা উল্লেখ করে এসব বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের উপস্থিতি ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।
এইচএসসি ফলাফল ২০২৬ এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার জিপিএ-৫ ছাত্রীদের পাসের হার শিক্ষা বোর্ড শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!