ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের ধরন ও পরিসরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেতু, টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি এখন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, জ্বালানি এবং উৎপাদনশীল শিল্পেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে আইস্মার্টইউ টেকনোলজি বিডির স্মার্টফোন উৎপাদন এ পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।
চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। দেশভিত্তিক একক বিনিয়োগের হিসাবে এটিই চীনকে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুঞ্জীভূত চীনা বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে হয় ২ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনের নিট এফডিআই ছিল ৩২১ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এই প্রবাহ ৫৪ শতাংশ বেশি ছিল। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়ায় বাংলাদেশে চীনা পুঁজির উপস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাব্য তালিকাতেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান শক্তিশালী। ইনভেস্ট বাংলাদেশের হিসাবে, দেশে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগের পাইপলাইন প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে থাকা ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ প্রায় ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৩৬৮ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে চীনা কোম্পানিগুলো যুক্ত রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতেই এসব প্রকল্প বিস্তৃত হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বিশেষায়িত চায়না ডেস্কের পাশাপাশি চীনের জাতীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা সিসিপিআইটিও কাজ করছে। ফলে সম্ভাব্য প্রকল্প থেকে বাস্তব বিনিয়োগে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ বাড়ছে।
উৎপাদন ও বস্ত্র খাতেও বড় অঙ্কের চীনা বিনিয়োগ আসছে। হ্যান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ মিরসরাই ও কেরানীগঞ্জে পোশাক এবং সমন্বিত বস্ত্র কারখানা স্থাপনের প্রাথমিক সমঝোতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করেছে। হেংলি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান লাইড বাংলাদেশ টেক্সটাইল টেকনোলজি আড়াইহাজারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় টেক্সটাইল মিল স্থাপন করছে।
চায়না লেসো গ্রুপও চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে পিভিসি পাইপ, সৌর প্যানেল ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের কারখানা গড়ে তুলছে। এসব প্রকল্পে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পের সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলেও চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বাড়ছে। সেখানে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছে। মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও লজিস্টিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মহেশখালীর কুতুবজোমে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বাস্তবায়নের সঙ্গেও চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি যুক্ত হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতেও চীনা বিনিয়োগের বিস্তার ঘটছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডে ডিরেকশন টেকনোলজি বাংলাদেশ লিমিটেড ব্লুটুথ ডিভাইস ও ডেটা ক্যাবল উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপন করছে। পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ের চীন সফরের সময় কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এসব প্রস্তাবের বড় অংশ প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কর্মীদের আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করার ফলে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। এর বাইরে সরবরাহব্যবস্থা ও লজিস্টিকস খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ছে।
তবে বিনিয়োগের এই ইতিবাচক প্রবাহের বিপরীতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ১৮ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৮০৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার।
ফলে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান বড়ই রয়ে গেছে। বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এখন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টিতে, চীনা বিনিয়োগের সুফল আরও বাড়াতে শুধু বিদেশি মূলধন আনার দিকে নজর দিলে হবে না। এর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সরবরাহ-সংযোগ তৈরি এবং দেশে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো গেলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতিও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চীন বাণিজ্য বিনিয়োগ অর্থনৈতিক শুল্ক আমদানি রপ্তানি
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!